সর্বশেষ সংবাদ
Home / অন্যান্য /  স্মৃতিচারণ: জীবনের সেরা জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ:)

 স্মৃতিচারণ: জীবনের সেরা জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ:)

স্মৃতিচারণ: জীবনের সেরা জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ:) ||

গেল বছর ইংরেজি মাস অনুযায়ী ১০ নভেম্বর ছিল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:)। ছোট বেলা থেকেই জশনে জুলুছে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ:)’র জন্য পাগল ছিলাম। বেড়ে উঠা সুফীবাদী মতাদর্শী পরিবারে। তাই ঈদে মিলাদুন্নবী এলে আলাদা এক আনন্দ বিরাজ করত শরীরের প্রতিটি শিরায়। যাইহোক ১০ নভেম্বরের জশনে জুলুছ ছিল চট্টগ্রামের এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে আমি নিজেই গর্বিত। তাই সেই জশনে জুলুছে ঈদে মিলাদুন্নবী(দ:) স্মৃতি-চরণ করতে লিখছি লেখাটা।

জুলুছের ঠিক ১৩দিন আগে চট্টগ্রাম থেকে আসলাম নিজ শহর হবিগঞ্জে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। ছ’দিনের ছুটি ছিল। ছুটি শেষ না হতেই শুনলাম জেডিসি এক্সামের কারনে মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা। খুলবে ২০ তারিখ। অপ্রত্যাশিত এক লম্বা ছুটি এসে জুটল কপালে। বেশ ভালই লাগছিল তখন। এদিকে চট্টগ্রামে শুরু হয়ে গিয়েছিল জশনে জুলুছের প্রস্তুতি। আমি চট্টগ্রাম থেকে আসার আগে থেকেই এ প্রস্তুতি চলমান ছিল। অক্টোবর এর মাঝামাঝি সময় থেকেই জামেয়ায় বসছিল আঞ্জুমানের সঙ্গে প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তর, গোয়েন্দা বাহিনী, সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মিটিং। হবিগঞ্জ আসার দিন রবিউল আউয়ালের স্বাগত মিছিলও করে এসেছিলাম।

৪ নভেম্বর ২০১৯। জুলুছে যোগদান করতে হুজুর কেবলা আল্লামা সৈয়দ তাহের শাহ (মা.জি.আ.) চট্টগ্রাম আগমন করলেন। সঙ্গে দুই শাহজাদা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাশেম শাহ ও আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামিদ শাহ হুজুর। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট থেকে জামেয়ার মাঠ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি। কয়েকশ গাড়ির বহর। আঞ্জুমান সিকিউরিটি ফোর্সের কড়া নিরাপত্তায় হুজুর কেবলা আলমগীর খানকা শরীফে পৌঁছালেন। হাজারো ভক্ত রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা জানালো উনাকে। হুজুর কেবলার আগমনে ভিন্ন মাত্রা যোগ হলো জুলুছ প্রস্তুতিতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসা শুরু করল চট্টগ্রাম। ১০ নভেম্বর, ১২ রবিউল আউয়াল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন উদযাপনের জন্য অধীর আগ্রহে দিন গুনছে সবাই।

৮ নভেম্বর। জুলুছের ঠিক দুদিন আগে চট্টগ্রামের পথে রওয়ানা হলাম আমি। সঙ্গে বন্ধু রিদওয়ান আহমেদ খান। রাত ৯টায় চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছলাম। রাতে নানা বাসায় উঠলাম। পরদিন দুপুরে নিজের বাসায় গেলাম। আগামীকাল জশনে জুলুছ। চারিদিকে আশেকে রাসূলদের আনাগোনা। আকাশে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। রাতে দাওয়াতে খায়র মাহফিল ছিল। বৃষ্টির কারণে সংক্ষিপ্ত করা হলো। আলমগীর খানকা শরীফে এশার নামাজ পড়ে বাসায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি।

এদিকে সবাই যখন জুলুছের আয়োজনে ব্যস্ত তখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গোপসাগরে তখন ঘুরছিল সময়ের অন্যতম শক্তিশালী সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হারিকেন আকার ধারন করে। চট্টগ্রাম বন্দরে তখন ১০নং সতর্কতা সংকেত জারি ছিল। জুলুছের আগেরদিন রাত থেকে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। এবস্থায় আগামীকালের জুলুছ নিয়ে আমি চিন্তিত থাকলেও জামেয়ার আশেপাশের কাউকেই খুব একটা চিন্তিত মনে হয়নি। হয়তো তারা জানতেন এ সাইক্লোনের ক্ষমতা নেই আশেকে রাসূলদের এ উৎসব ঠেকানোর। জুলুছ উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মেহমান এসেছিলেন ওইদিন বাসায় এসেছিলেন। আজকের রাত এখানে থেকে আগামীকাল জুলুছে যোগদান করতে। রাত দু’টায় ঘুমাতে গেলাম।

১০ নভেম্বর-২০১৯। আরবি ১২ই রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি। চট্টগ্রাম শহরের যানচলাচল সকাল থেকে প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে বসে রইলাম। সকাল ৭টা থেকে জ্বলওয়ায়ে নূর সুন্নি পরিষদের সকল সদস্যরা বাসায় আসতে লাগলেন। বৃহত্তর সিলেট বিভাগের সকল ছাত্রদের জন্য পাঞ্জাবি তৈরি করা হয়েছে। এই পাঞ্জাবি পড়েই বের হবে সবাই। সবাই সবার পাঞ্জাবি বুঝে নিয়ে তা পড়ে রেডি হয়ে গেলাম জামেয়ার মাঠে। জামেয়ার মাঠ সবুজ পতাকা, ব্যানার, লাইটিংয়ে সুসজ্জিত। জুলুছ মাঠ, জামেয়ার মাঠ, আশেপাশের পুরো এলাকায় শুধু মানুষ আর মানুষ। সবাই যার যার পছন্দ মতো পতাকা নিয়ে হজরত শাহজালাল রহ. ছাত্রকল্যাণ পরিষদ, বৃহত্তর সিলেটের ব্যানারে মিছিল নিয়ে গেলাম বিবিরহাট মোড়ে। আশেপাশে শুধু মানুষ আর মানুষ। তিল পরিমান ঠাঁই নাই। পিছনে অক্সিজেন পর্যন্ত মানুষের সারি। এগুলাম সামনের দিকে। উদ্দেশ্য জমায়েত দেখা। অক্সিজেন থেকে পাঁচলাইশ থানা মোড়, বহদ্দার হাট থেকে ২নং গেট লক্ষ লক্ষ মানুষ। মুরাদপুর চত্তর দেখলে তো অবস্থা শেষ। মানুষের পারায় মানুষ মরে অবস্থা। পুরো এলাকা জুড়ে পুলিশ, র্যাব, আনসার বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। সাদা পোশাকে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার অসংখ্য সদস্য ঘুরপাক করছে চারদিকে। কোথাও জায়গা না পেয়ে শেষে পাঁচলাইশ থানার সমানে এসে দাঁড়াতে হলো। অপেক্ষা হুজুর কেবলার আগমনের।

চট্টগ্রাম শহরে সেদিন ১০নং সতর্কতা সংকেত জারি ছিল। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এর তান্ডবে সারাদেশে চলছিল মুষলধারে বৃষ্টি। আশ্চর্য হলেও সত্যি উপকূলীয় অঞ্চল চট্টগ্রামে সেদিন বৃষ্টি কিংবা দমকা হওয়ার ছিটে ফোটাও ছিল না। উল্টো সকালে পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়েছে সোনালী রোদ। এজন্য মহান আল্লাহর এক অপরূপ নিয়ামত। নবীর বংশধরদের এটাই কেরামত। যারা বৃষ্টির জন্য জুলুছ হবেনা ভেবে লাফাচ্ছিল, তাদের আশায় পড়ল এক বালতি পানি।

দীর্ঘ ৩০ মিনিটের অপেক্ষার পর অবশেষে অসংখ্য গাড়ি বহরের এক স্রোত আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। প্রথম স্তরে মোটরসাইকেল, তারপর নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি, পায়ে হেটে অসংখ্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। অতঃপর সেই পরিচিত বাহন নিয়ে হুজুর কেবলার আগমন। পিছনে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোত। হুজুর কেবলার সেই নুরানী চেহারা দেখার জন্য তারা ছুটছে। এ চেহারা আওলাদে রাসূলের। এটা একবার দেখলে মন ভরে না। বারবার দেখতে হয়। তারপরও শখ মিটে না। সবার মনে একটাই আশা। আহ! যদি হুজুর কেবলা আজ আমার দিকে চেয়ে নুরানী তাবসাসমুম প্রদর্শন করেন। সেই মুচকি হাসির নূর যদি আমার কপালে জুটে! সেই আশায় হাজারো আশেকে রাসূল প্রানের মায়া ত্যাগ করে ছুটে চলেছে সেই গাড়ির দিকে। নাহ! উনি হ্যামিল্টনের বাঁশিওয়ালা নন। উনি আওলাদে রাসূল। উনার এক নুরানী চেহারা দেখার জন্য কয়েকশ ইঁদুর পিছনে পিছনে যায়নি। গিয়েছে লক্ষ লক্ষ আশেকে রাসূল। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যান তথ্য অনুসারে সেই জুলুছে মানুষ হয়েছিল ৬০ লক্ষেরও বেশি। দেশের জনসংখ্যার ৩০ ভাগের ১ভাগ।

মিলাদুন্নবী অনেকেই মানতে চাননা। কেউ বিদআত, আর কেউ হারাম বলে ফতুয়া দেন। কসম খোদার! এই জুলুছে আমি পেয়েছি এক কোরআনের বাগান। মাইকে চলছে দেশ বরেণ্য ক্বারীদের কন্ঠে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত। এরপরই পরিবেশন করা হচ্ছে অসংখ্য শায়েরের কন্ঠে পবিত্র নাতে মোস্তফা (দ:)। এজন্য কোরআনের কোনো এক বাগান। বিরিয়ানি খাওয়ার লোভে একটা মানুষও আসে নাই। এখানে আমি দেখতে পেয়েছি অসংখ্য মানবসেবীও। আমার পাশের একজন ১০০০ চকলেট নিয়ে এসেছেন মিছিলে। উনি কোনো দলের কর্মী নন। সাধারণ একজন মানুষ, ছোটখাটো ব্যবসায়ী। জিজ্ঞেস করলাম চকলেট কেন। বললেন ভাই, এখানে তো লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছেন। সবাই আল্লাহর রাসূলের প্রেমে জুলুছ করছেন। নাত গাইতে আর স্লোগান দিতে দিতে মুখ যদি শুকনা হয়ে গিয়ে কষ্ট পান, সেই জন্য আমি চকলেট নিয়ে এসেছি। মুখ শুকিয়ে গেলে কিছুক্ষণ চকলেট মুখে দিলে আবার মুখে পানি এসে যাবে। দেখুন, এক মুসলিম ভাইয়ের জন্য অপর ভাইয়ের প্রেম, ভালোবাসা। অসংখ্য মানুষ ছিল এমন যারা নিজ দায়িত্বে পানি, খেজুর, চিপস, মিষ্টি, চকলেট, সহ অসংখ্য খাদ্য দ্রব্য নিয়ে এসেছেন জুলুছে অংশগ্রহণ করা মানুষদের খেদমতে। আহ! এটা যেন জুলুছ নয়, মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক বন্ধন।

পুরো শহর প্রদক্ষিণ শেষে দুপুর দু’টায় পৌছালাম জামেয়ার মাঠে। সেখানে দেশ বরেণ্য অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তৃতা করছিলেন। বেলা ৩টায় জোহরের নামাজের জন্য মঞ্চে এলেন হুজুর কেবলা শাহজাদা আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ কাশেম শাহ হুজুর। আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো জোহরের নামাজ। কয়েক লক্ষ মানুষ এক সঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষ হতে না হতেই শুরু হলো আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি যা শেষ হবার নয়। কেউ গেল না। বৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। বয়ান শুনল। হুজুর কেবলা তাশরীফ আনলেন। বায়াত করালেন। বেলা ৪টায় আসরের নামাজ আদায় হলো। ততক্ষনে বৃষ্টির তান্ডবে পানি উঠে গিয়েছিল জামেয়ার মাঠে, আশেপাশের রাস্তায়। সেই পানির মধ্যেই ভিজে ভিজে নামাজ আদায় করলেন কয়েক লক্ষ মুসল্লি। এটাই কি সঠিক মুসলমানদের পরিচয় নয় ? অনেকেই বলেন মিছিল করে মানুষ নামাজ পড়েনা। জুলুছে না যাওয়ার ফতোয়া দেয়। আমি সাক্ষী যে একবার এ জুলুছে গিয়েছে , সে প্রেমে পড়েছে নবীজির প্রতিটি সুন্নাতের। জুলুছ থেকে ফিরে আসতে চায়নি কেউই। হাজার বৃষ্টি হোক, তারপরও অন্তরে রয়েছে নবীর প্ৰেম ক্লান্তি গিয়েছে মুছে। এটাই উৎসব। মুসলিমদের আসল উৎসব। জশনে জুলুছে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

লেখক: গোলাম শাফিউল আলম মাহিন
শিক্ষার্থী: জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
মোবাইল: ০১৭৭-৯৪৫৪৭২১

পোস্টটি শেয়ার করুন
Share

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে মোবাইল চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে কিশোরের মৃত্যু

এইচ অার রুবেল হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি : বানিযাচংয়ে মোবাইল চার্জ করতে গিয়ে ...