মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক, অর্থনীতির পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ল্যারি সামার্সের সঙ্গে বর্তমান ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের শুল্ক নীতি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
বিষয়টি হলো, চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হলে তার বোঝা চীনা প্রস্তুতকারকদের ওপর পড়বে বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। কিন্তু এই যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ল্যারি সামার্স। বিল ক্লিনটনের আমলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সামার্সের মতে, বেসেন্টের এই ধারণা অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি বলেন, এমন একটি ‘হাস্যকর’ দাবির পক্ষে কোনো যুক্তি বা প্রমাণ নেই।
উদাহরণস্বরূপ, সামার্স উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাতের দামে ব্যাপক উল্লম্ফন হয়েছে। এর ফলে নতুন গাড়ির দাম কয়েকশো ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মিডওয়েস্ট হট-রোল্ড কয়েল স্টিলের দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন ১,০৪৪ ডলার। যা ট্রাম্পের নির্বাচনের আগেকার দামের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি।
উল্লেখ্য, গত ১০ই ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ সব ধরনের আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এর ফলস্বরূপ, ১২ই মার্চ থেকে এই শুল্ক কার্যকর হয়।
অন্যদিকে, ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, “আমি আত্মবিশ্বাসী যে, চীনা প্রস্তুতকারকদেরই এই শুল্কের বোঝা বহন করতে হবে, ফলে পণ্যের দাম বাড়বে না।
তবে, হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে সামার্সের এই সমালোচনার জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য দেশ থেকে জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে পারে। যেমন – পোশাক, জুতা, ইলেকট্রনিকস, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, “যদি আমরা এসব পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল থাকতাম, তাহলে ল্যারি সামার্স ঠিক বলতেন। কিন্তু যেহেতু চীনের বাইরেও আমাদের পণ্য পাওয়ার সুযোগ আছে, তাই এই শুল্ক আমাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে না।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের আওতায় রয়েছে চীন থেকে আমদানি করা প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের এই আগ্রাসী নীতি ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সিটি গ্রুপের অর্থনীতিবিদরা তাদের ক্লায়েন্টদের জন্য লেখা এক নোটে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর শুল্কের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ১৯৪০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ।
এদিকে, ভোক্তারা, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কারণ, বাইডেন প্রশাসনের সময় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গার্টনারের করা এক জরিপে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা শুল্ক বৃদ্ধির প্রায় ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপানোর পরিকল্পনা করছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর শেয়ার বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন শুল্ক হয়তো পূর্বের ধারণার চেয়ে কম পণ্যের ওপর আরোপ করা হবে। তবে, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এর ফলে চীন, ভারত ও স্পেনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাণিজ্য নীতির এই ধরনের পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য নীতির পক্ষে দেওয়া যুক্তিগুলো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অর্থনীতির মূল ধারণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
তথ্য সূত্র: সিএনএন