ভারতীয় চিত্রশিল্পী অর্পিতা সিং-এর লন্ডনে প্রদর্শনী, শিল্পকলার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন।
অর্পিতা সিং, ভারতীয় চিত্রকলার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কাজের সম্মানে লন্ডনের সের্পেন্টাইন গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ‘রিমেম্বারিং’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রদর্শনী।
এই প্রদর্শনীটি শুধু তাঁর কাজের এক ঝলক নয়, বরং ৬ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পী হিসেবে তাঁর পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। নিজের দেশ ভারতের বাইরে এই প্রথম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্যালারিতে একক প্রদর্শনী হচ্ছে তাঁর।
৮৭ বছর বয়সী অর্পিতা সিং, যিনি তাঁর দিল্লির স্টুডিওতেই অধিকাংশ সময় কাটান, এই সম্মানে বিশেষভাবে উচ্ছ্বসিত নন। তাঁর মতে, “সের্পেন্টাইন একটি সুপরিচিত গ্যালারি, তাই এটি আমার জন্য অবশ্যই সম্মানের।”
তাঁর তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটে ওঠে বিচিত্র সব চরিত্র, যাঁর মধ্যে নারী, পুরুষ, পাখি, ফুল, লতাপাতা—সবকিছুই যেন এক মিশ্র জগৎ তৈরি করে। তাঁর ছবিতে গল্প বলার ঢং, চিত্রকর্মের বুনন, আর অলঙ্করণের প্রাচুর্য দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মাই ললিপপ সিটি: জেমিনি রাইজিং’-এ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ এবং আকারের পরিবর্তন দেখা যায়, যা পুরাতন চিত্রকলার কথা মনে করিয়ে দেয়।
অর্পিতা সিং-এর কাজের ওপর আধুনিকতাবাদী ইউরোপীয় শিল্পকলার গভীর প্রভাব রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে দিল্লির পলিটেকনিক-এ পড়ার সময় তিনি আধুনিকতাবাদী শিল্পী বীরেন দে এবং শৈলজ মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন।
তিনি কান্দিনস্কি এবং ডের ব্লাউ রাইটার-এর মতো শিল্পীদের কাজে মুগ্ধ হয়েছিলেন। যদিও সে সময়ে আন্তর্জাতিক শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ সীমিত ছিল, তবুও তাঁর আগ্রহ ছিল অপরিসীম। পরবর্তীকালে তিনি পল ক্লীর লেখাগুলোও পড়েন।
পল ক্লীর কাজের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল এতটাই গভীর যে, তাঁর লেখাগুলি পড়ার ৪৮ বছর পর, তিনি সুইজারল্যান্ডে ক্লীর আসল চিত্রকর্ম দেখার সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ক্লীর প্রভাব তাঁর আর্টের ওপর বিশেষভাবে পড়েছে। সের্পেন্টাইন গ্যালারিতে তাঁর প্রদর্শনীতে রাখা প্রথম দিকের জলরংয়ের কাজগুলি এর প্রমাণ।
শিল্পকলার ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে অর্পিতা সিং, সরকারি সংস্থা ‘উইভার্স সার্ভিস সেন্টার’-এ পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই সময়ে তিনি বিভিন্ন শৈলীতে কাজ করেছেন, যেখানে মার্ক শাগাল-এর কল্পনাবাদী জগৎ এবং পরাবাস্তবতার একটি মিশ্রণ দেখা যায়।
শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর, তিনি কিছুদিনের জন্য নিজের চিত্রকর্মের ধারা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তিনি মনে করেছিলেন, “ক্যানভাসে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছি না।” তাই তিনি ছবি আঁকা থেকে দূরে গিয়ে কিছুকাল ‘ডটস’ ও ‘লাইনস’-এর ওপর কাজ করা শুরু করেন।
তাঁর কথায়, “ছয় বছর ধরে আমি এই ডটস ও লাইনস-এর পুনরাবৃত্তি করেছি। এর থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিমূর্ত রূপ তৈরি হয়।” পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে যখন তিনি আবার চিত্রকর্ম শুরু করেন, তখন তাঁর কাজে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালের প্রেক্ষাপট ফুটে ওঠে।
তাঁর ছবিতে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি, নারীর প্রতিচ্ছবি—এসব বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর ছবিতে নারী চরিত্ররা পুরুষের চেয়ে বেশি স্থান জুড়ে থাকে। ‘দেবী পিস্তল ওয়ালী’ নামক ছবিতে দেবীমূর্তির হাতে একটি পিস্তল দেখা যায়।
শিল্পী তাঁর কাজে নারী-পুরুষের ক্ষমতা অথবা দুর্বলতাকে ভিন্নভাবে দেখেন না।
নিজের কাজ সম্পর্কে অর্পিতা সিং কখনোই কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে চাননি। তিনি শিল্পী জীবনের শুরুতে বোম্বের প্রগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ এবং গ্রুপ ১৮৯০-এর মতো বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন।
তাঁর মতে, “রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের ঘটনাগুলি আমার ছবিতে আসে, ঠিক যেমন আলো রঙ হয়ে আসে, অথবা বাতাস আসে গতি হয়ে।”
অর্পিতা সিং-এর কাজগুলি তাঁর নিজস্ব জগৎ এবং অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর শিল্পীসত্তা সবসময়ই নতুন কিছু গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে।
তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত ফর্ম এবং দৃশ্যের নাটকীয়তা দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তাঁর ক্যানভাসে রঙের ব্যবহার এতটাই স্বাভাবিক যে, মনে হয় ছবিগুলো যেন নিজেরাই নিজেদের আঁকছে।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।