শিরোনাম: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত, বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগ
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে চরম আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। আর এই পরিস্থিতিতে শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানি অ্যালিয়েনজ-এর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে পুঁজিবাদ।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের আর্থিক কাঠামো অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্যেও গভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে।
জার্মানীর এই বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান গুন্থার থ্যালিংগার জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এতটাই বাড়ছে যে, ভবিষ্যতে অনেক ক্ষেত্রে বীমা করা সম্ভব হবে না। এর ফলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা, যেমন— মর্টগেজ বা বিনিয়োগ।
বর্তমানে বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ এখনো বাড়ছে। বিদ্যমান নীতি অনুযায়ী, পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ববর্তী যুগের চেয়ে ২.২ থেকে ৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। থ্যালিংগার উল্লেখ করেন, তাপমাত্রা যদি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তবে ক্ষয়ক্ষতি এত ব্যাপক হবে যে সরকারগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিগত এক দশকে চরম আবহাওয়ার কারণে বিশ্বে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এক দশকে চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে, শুধু ২০২৪ সালেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার।
বীমা শিল্পের মূল ভিত্তি হলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। বৈশ্বিক উষ্ণতার বিপদ সম্পর্কে তারা অনেক আগে থেকেই অবগত। থ্যালিংগার বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে শূন্য-নিঃসরণ শক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।
এখন প্রয়োজন দ্রুতগতিতে এর প্রয়োগ ঘটানো। আমাদের বাজার, অর্থ এবং সভ্যতার টিকে থাকার জন্য এটি জরুরি।’
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের জাস্ট ট্রানজিশন ফাইনান্স ল্যাবের চেয়ারম্যান নিক রবিন্স এই বিষয়ে বলেন, ‘বৈশ্বিক বীমা খাতের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের এমন বিশ্লেষণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট আর্থিক এবং সভ্যতার প্রতি হুমকিকে তুলে ধরেছে।
বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাবেক সহকারী মহাসচিব জ্যানোস পাজস্টর বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষেত্রে বীমা খাত একটি সতর্ক ঘণ্টা।’
থ্যালিংগার তার এক নিবন্ধে জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘তাপপ্রবাহ ও জল সম্পদের ক্ষতি করে। বন্যা ঘরবাড়ির মূল্য কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত গরম শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সম্পদের বিশাল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা দ্রুত এমন তাপমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি—১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস—যেখানে অনেক ঝুঁকির ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানিগুলো কভারেজ দিতে পারবে না। অঙ্কটা আর মিলবে না: মানুষের বা কোম্পানির দেওয়ার সামর্থ্যের চেয়ে প্রিমিয়াম বেশি হবে।
এটি ইতিমধ্যে ঘটছে। কিছু অঞ্চল বীমার অযোগ্য হয়ে পড়ছে।’ ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলের কারণে সেখানকার কোম্পানিগুলো কীভাবে গৃহ বীমা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে, সেই উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন।
থ্যালিংগার একে একটি পদ্ধতিগত ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ‘আর্থিক খাতের ভিত্তিকেই হুমকিতে ফেলছে’। বীমা না থাকলে অন্যান্য আর্থিক পরিষেবাও পাওয়া যাবে না। তাঁর মতে, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট একটি ‘ঋণ সংকট’।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি কেবল আবাসন, অবকাঠামো, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উপকূলীয়, শুষ্ক এবং দাবানল-প্রবণ অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য আর্থিক হিসাব থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করবে।
বাজার দ্রুত এবং কঠোরভাবে নতুন মূল্য নির্ধারণ করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাজারের এমন বিপর্যয় দেখা দেবে।’
থ্যালিংগার মনে করেন, জলবায়ু মডেলগুলো যেমনটা বলছে, তেমনভাবে যদি একের পর এক বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে, তবে কোনো সরকারই সেই ক্ষতি মোকাবিলা করতে পারবে না। তিনি উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করেন, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার দুর্যোগ পুনরুদ্ধার ব্যয় সাতগুণ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ুর খারাপ প্রভাবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব’—এমন ধারণা একটি ‘মিথ্যা সান্ত্বনা’। ‘মানব সহনশীলতার বাইরে তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মিত শহরগুলো চাইলেই উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বীমা করা, সরকার কর্তৃক আচ্ছাদন করা বা মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এর অর্থ হবে—মর্টগেজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন আবাসন তৈরি না হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার অবসান।
থ্যালিংগার বলেন, ‘আর্থিক খাত, যেমনটা আমরা জানি, সেটি অচল হয়ে পড়বে। আর এর সঙ্গে সঙ্গেই পুঁজিবাদও তার কার্যকারিতা হারাবে।’
এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো অথবা কার্বন নিঃসরণ কমানো। অন্য সব পদক্ষেপ কেবল সময়ক্ষেপণ করবে। থ্যালিংগার বলেন, পুঁজিবাদকেই এই সংকট সমাধান করতে হবে, যার শুরুটা হওয়া উচিত—অর্থনৈতিক লক্ষ্যের মতোই জলবায়ু স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু বিষয়ক পদক্ষেপকে ‘সবুজ ভেল্কিবাজি’ হিসেবে অভিহিত করার পর অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জলবায়ু কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে। থ্যালিংগার ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলেন, ‘পদক্ষেপ না নেওয়ার চেয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার খরচ বেশি।
আমরা যদি এই পরিবর্তন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারি, তবে একটি আরও কার্যকর, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি এবং উন্নত জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা লাভ করব।’
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ অনেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ এমনিতেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এসব সমস্যা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংকট সৃষ্টি হবে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং মানুষের জীবনযাত্রা।
তাই, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান