স্বাস্থ্যখাতে রোগ নির্ণয়ের এক নতুন দিগন্ত : বাড়ছে কি অসুস্থতা, নাকি বাড়ছে রোগ চিহ্নিতকরণের প্রবণতা?
চিকিৎসা বিজ্ঞান দিন দিন উন্নত হচ্ছে, বাড়ছে রোগ নির্ণয়ের অত্যাধুনিক কৌশল। কিন্তু এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিষয়ক নতুন একটি বই মানুষের মধ্যে তৈরি করছে গভীর চিন্তা। সুজান ও’সুলিভানের লেখা ‘দ্য এজ অফ ডায়াগনসিস: সিকনেস, হেলথ অ্যান্ড হোয়াই মেডিসিন হ্যাজ গন টু ফার’ (The Age of Diagnosis: Sickness, Health and Why Medicine Has Gone Too Far) বইটিতে রোগ নির্ণয়ের বর্তমান প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লেখক মনে করেন, বর্তমান সময়ে রোগের সংখ্যা হয়তো বাড়ছে না, বরং বাড়ছে রোগ চিহ্নিত করার প্রবণতা।
বইটিতে লাইম রোগ, অটিজম এবং এডিএইচডি’র (ADHD) মতো বিষয়গুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। লাইম রোগ নিয়ে সুজান ও’সুলিভান বলেছেন, কানেকটিকাটের লাইম অঞ্চলে ফ্লু-এর মতো কিছু উপসর্গ দেখা যেত, সেই সাথে চামড়ায় র্যাশ এবং জয়েন্টে ব্যথা ছিল সাধারণ ঘটনা। সেখানকার মানুষেরা মনে করতেন, তাদের এই সমস্যার কারণ হলো সেখানকার হরিণ এবং তাদের শরীরে থাকা টিক (tick)। কিন্তু রোগ নির্ণয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় না থাকায় চিকিৎসকেরা বিষয়টিকে মানসিক সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যেতেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে কানেকটিকাট স্বাস্থ্য বিভাগ এই রোগের কারণ অনুসন্ধানে নামে। দীর্ঘ সাত বছর পর ১৯৮২ সালে তারা জানতে পারেন, ‘টিক’-এর শরীরে থাকা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বর্তমানে লাইম রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু লেখক মনে করেন, অনেক সময় এই পরীক্ষার ফল ভুল আসতে পারে। যেমন, অতিরিক্ত সংবেদনশীল পরীক্ষার কারণে ফল ‘পজিটিভ’ আসতে পারে, আবার দুর্বল পরীক্ষার কারণে ‘নেগেটিভ’ ফলও আসতে পারে। এছাড়া, রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস এবং উপসর্গগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বইটিতে অটিজম এবং এডিএইচডি’র উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে যেখানে প্রতি ১০,০০০ জনে ৪ জন অটিজমে আক্রান্ত ছিল, সেখানে বর্তমানে প্রতি ১০০ জনে ১ জন অটিজমে আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে অটিজম নির্ণয়ের হার বেড়েছে ৭৮৭ শতাংশ। একই সময়ে এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারএকটিভিটি ডিসঅর্ডার) নির্ণয়ের হারও বেড়েছে, যা আগে শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
সুজান ও’সুলিভান মনে করেন, এই পরিসংখ্যানগুলো কি রোগের প্রকৃত বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, নাকি রোগ নির্ণয়ের প্রবণতা বাড়ছে? তার মতে, হয়তো হালকা শারীরিক সমস্যাগুলোকেও এখন গুরুতর রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির ফলে একদিকে যেমন রোগ নির্ণয় সহজ হয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণও সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, ক্যান্সারের ঝুঁকিপূর্ণ জিন (যেমন BRCA) শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তি এসেছে, যা হয়তো ভবিষ্যতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নির্দেশ করে। কিন্তু এই বিষয়ে আগে থেকে জেনে রাখাটা কতটা জরুরি? নাকি এটি মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করে?
সুজান ও’সুলিভান মনে করেন, চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব হলো রোগীর কোনো ক্ষতি না করা। তাই, কোনো রোগ নির্ণয়ের আগে চিকিৎসকদের রোগীদের কথা শোনা উচিত এবং তাঁদের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। একইসঙ্গে রোগীদেরও মনে রাখতে হবে, ভালো স্বাস্থ্য সবসময় একই রকম থাকে না এবং সব সমস্যার সমাধান চিকিৎসক দিতে পারবেন না।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান