উত্তর কোরিয়া নতুন করে তাদের রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে ১০,০০০ অ্যাপার্টমেন্ট বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক আবাসিক এলাকা তৈরি করেছে। দেশটির নেতারা এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন, যা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন এই আবাসিক এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে “হওয়াসং।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক মহল থেকে নিজেদের অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ নিঃসন্দেহে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ।
সরকারি সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ’র প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, নতুন এই আবাসিক জেলাটিতে আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো প্রশস্ত সড়ক থেকে উপরে উঠে গেছে। প্রকল্পটি মূলত রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটি বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য হলো দেশটির নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
২০২১ সালে উত্তর কোরিয়া সরকার একটি উচ্চাভিলাষী পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যেখানে পিয়ংইয়ংয়ে আরো ৫০,০০০ অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে ভালো।
তবে, চকচকে ছবি আর আধুনিক স্থাপত্যশৈলী সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার আবাসিক জীবন সব সময় বিলাসবহুল নয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক সময় অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের লিফটগুলো বিকল হয়ে যায়, ফলে উপরের তলার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে বেশ অসুবিধা হয়।
দেশটির একাধিকবার সফরকালে সিএনএন এমন চিত্র প্রত্যক্ষ করেছে। সাধারণত, বয়স্ক বাসিন্দাদের শারীরিক কষ্টের কথা বিবেচনা করে নিচু তলার অ্যাপার্টমেন্টে এবং তরুণ প্রজন্মের বাসিন্দাদের উপরের তলার অ্যাপার্টমেন্টে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
উত্তর কোরিয়ার জন্য আবাসন সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির দুর্বল অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান পণ্যের মূল্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংকটও একটি উদ্বেগের বিষয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইনস্টিটিউট অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বিল্ডিং টেকনোলজির গবেষকদের ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির আবাসনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক বাড়ি নেই। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে, অনেক বাড়িঘর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং সেখানে বিদ্যুৎ, পরিষ্কার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।
নতুন এই আবাসিক এলাকায় বেশ কয়েকটি উঁচু টাওয়ার রয়েছে, যার মধ্যে দুটি আকাশপথে নির্মিত একটি সংযোগ সেতু দ্বারা যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, এখানে শিক্ষা, বাণিজ্য ও সেবামূলক বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।
কেসিএনএ জানিয়েছে, এই প্রকল্পের নকশার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন দেশটির নেতা কিম জং উন এবং তিনি নির্মাণ পরিকল্পনা তৈরিতে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আগামী ১৫ এপ্রিল, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-sung এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অনুষ্ঠানেই নতুন আবাসিক এলাকার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
হওয়াসং এলাকার নির্মাণকাজ তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি সংবাদ মাধ্যমে এলাকাটিকে “সুন্দর ও আধুনিক নগর অঞ্চল” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য “নতুন সমৃদ্ধির যুগের” প্রতীক।
প্রায় পাঁচ বছর আগে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে দেশটি বাইরের জগৎ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
যদিও সম্প্রতি কিছু সংখ্যক রুশ পর্যটককে দেশটি সফরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে বিদেশি পর্যটকদের জন্য দেশটির দরজা এখনো পুরোপুরি খোলা হয়নি।
হওয়াসং, পিয়ংইয়ংয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পন্ন হওয়া নগর উন্নয়ন প্রকল্পের একটি অংশ। এর আগে, মিরাই সায়েন্টিস্ট স্ট্রিট এবং সংওয়া স্ট্রিটের আশেপাশে বেশ কয়েকটি বড় আবাসিক প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে।
সংওয়া স্ট্রিট মেইন টাওয়ার দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন, যা ২০২২ সালে নির্মিত হয়েছে।
উত্তর কোরিয়া শুধু পিয়ংইয়ংয়েই নয়, খনি শহর ও গ্রামীণ এলাকাতেও আবাসনের প্রসার ঘটাচ্ছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির আধুনিকায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে এতে সৈন্যদের পাশাপাশি বেসামরিক শ্রমিকদেরও কঠোর পরিবেশে সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করতে হচ্ছে।
সরকার বাসস্থান বরাদ্দ করে থাকে। এক্ষেত্রে, ক্ষমতাসীন কিম পরিবারের প্রতি সবচেয়ে অনুগত এবং দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যেমন – বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী।
সরকারি সংবাদ মাধ্যম প্রায়ই রাজধানীর নির্মাণকাজের গতি নিয়ে গর্ব করে থাকে এবং একে “পিয়ংইয়ং স্পিড” বলে অভিহিত করা হয়। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেন, রাজধানীর রিয়োমিয়ং নিউ টাউনে ৭০ তলা বিশিষ্ট একটি আকাশচুম্বী ভবনের কাঠামো তারা মাত্র ৭৪ দিনে সম্পন্ন করেছেন।
তবে, নির্মাণ সামগ্রীর মান এবং নির্মাণশ্রমিকদের কাজের গুণগত মান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে পড়ার পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ওই দুর্ঘটনায় অনেক পরিবারের সদস্যরা হতাহত হয়েছিল। সরকারি সংবাদ মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে “ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ” এবং “কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীন তত্ত্বাবধান”-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
উত্তর কোরিয়ার নির্মাণ প্রকল্পে দেশটির সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটির বিশাল সামরিক বাহিনী, যারা সক্রিয়ভাবে নির্মাণকাজে যুক্ত থাকে, নতুন এই জেলার নির্মাণেও সহায়ক হয়েছে।
কিম জং উন সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর সরকারের নির্মাণ পরিকল্পনা ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদী লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও বিস্তৃত। গত মাসে তিনি বলেন, রাজধানীর “পুরোনো ও জরাজীর্ণ” এলাকাগুলোও অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে সাজানো হবে।
তথ্য সূত্র: সিএনএন