যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানের ঘুরে দাঁড়ানো এবং বিশ্ব জয়: ‘হ্যালো কিটি’র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, জাপান যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখন তাদের সামনে নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করার চ্যালেঞ্জ ছিল।
যুদ্ধকালীন ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি তখনও বিশ্ববাসীর মনে গভীর দাগ কেটেছিল। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে, জাপান বেছে নিয়েছিল এক ভিন্ন পথ – কোমল শক্তি বা ‘সফট পাওয়ার’-এর কৌশল। আর এই পথে তাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘হ্যালো কিটি’।
১৯৭৪ সালে স্যানরিও (Sanrio) নামক একটি জাপানি কোম্পানি ‘হ্যালো কিটি’ চরিত্রটি তৈরি করে। সাদা বিড়ালের আদলে তৈরি, লাল ফিতা পরিহিত এই কার্টুন চরিত্রটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
কিন্তু এর পেছনের গল্পটা আরও গভীর। হ্যালো কিটি শুধু একটি কার্টুন চরিত্র নয়, বরং জাপানের ‘কাওয়াই’ (kawaii), অর্থাৎ ‘চুলবুলি’ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই ‘কাওয়াই’ সংস্কৃতি জাপানি সমাজে নারী স্বাধীনতা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে, জাপান চেয়েছিল বিশ্ব দরবারে নিজেদের একটি নতুন, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরতে। তাই তারা তাদের সংস্কৃতিকে কাজে লাগায়। হ্যালো কিটির মতো আকর্ষণীয় চরিত্রগুলো ছিল সেই কৌশলের অংশ।
এই চরিত্রগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে জাপান বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিল তারা আর আগের আগ্রাসী দেশ নেই, বরং শান্তি ও বন্ধুত্বের পথে বিশ্বাসী।
১৯৮০-এর দশকে হ্যালো কিটি আমেরিকার শিশুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৮৩ সালে, হ্যালো কিটিকে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের (UNICEF) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
এরপর, জাপানের সরকারও ‘কাওয়াই’ সংস্কৃতিকে তাদের ‘কুল জাপান’ নামক প্রকল্পের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে, কার্টুন, ফ্যাশন এবং হ্যালো কিটির মতো জনপ্রিয় চরিত্র ব্যবহার করে জাপানের সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
জাপান সরকার তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে হ্যালো কিটিকে পর্যটনের দূত হিসেবেও নিয়োগ করে, যাদের সঙ্গে অতীতে তাদের তিক্ত সম্পর্ক ছিল।
এই কৌশল ছিল অত্যন্ত সফল। ‘কাওয়াই’ সংস্কৃতি জাপানের ভাবমূর্তি কোমল ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বর্তমানে, হ্যালো কিটি একটি বহুজাতিক ব্র্যান্ড। এর পণ্য সারা বিশ্বে পাওয়া যায়। এমনকি, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ‘কাওয়াই অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ করে, যারা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জাপানি সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ‘কাওয়াই’ সংস্কৃতি জাপানের জন্য একদিকে যেমন একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং কৌশল, তেমনি এটি একটি কূটনৈতিক হাতিয়ারও। এর মাধ্যমে জাপান বিশ্ব দরবারে নিজেদের একটি ইতিবাচক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
তথ্য সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক