যুক্তরাষ্ট্রে নতুন গাড়ির কারখানা নির্মাণ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা দাবির সত্যতা কতটুকু? সম্প্রতি এমন একটি প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার নীতিমালার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে রেকর্ড সংখ্যায় গাড়ির কারখানা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দাবিটি সম্ভবত অতিরঞ্জিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই দাবির কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউস সম্প্রতি হুন্দাই, স্টেলান্টিস এবং হোন্ডার মতো কিছু গাড় প্রস্তুতকারক সংস্থার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছে।
তবে অটোমোবাইল শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘোষণাগুলো মূলত বিদ্যমান কারখানাগুলোতে বিনিয়োগের পুনঃবণ্টন, নতুন করে কারখানা তৈরি নয়। আর এই পরিকল্পনাগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উত্তর আমেরিকান অটো শিল্পের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ড. দিমিত্রি আনাস্তাকিসের মতে, “কারখানাগুলো সাধারণত কয়েক বছর আগে পরিকল্পনা করা হয়। তাই ট্রাম্পের আমলে এই ধরনের সাফল্যের কৃতিত্ব দেওয়াটা সঠিক হবে না।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্প্রতি তিনটি বিদেশি গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
* **হুন্দাই:** দক্ষিণ কোরিয়ার এই সংস্থাটি তাদের জর্জিয়ার কারখানায় উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে।
একই সাথে, তারা আলাবামার কারখানায়ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
এছাড়াও, হুন্দাই লুইসিয়ানায় প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগে একটি ইস্পাত কারখানা তৈরি করতে যাচ্ছে, যা তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করবে।
* **হোন্ডা:** জাপানি এই কোম্পানিটি তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সিভিক হাইব্রিড গাড়ি মেক্সিকোর পরিবর্তে ইন্ডিয়ানাতে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোন্ডা ২০২৮ সালের মে মাস থেকে ইন্ডিয়ানার একটি কারখানায় বছরে ২ লাখ ১০ হাজার সিভিক তৈরির পরিকল্পনা করছে।
* **স্টেলান্টিস:** ক্রাইসলার, জীপ, ফিয়াট সহ আরও কিছু গাড়ির মালিক এই ডাচ কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
এর অংশ হিসেবে, তারা ইলিনয়ের একটি পুরনো অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জীপ চেরোকি তৈরি হতো।
তারা ২০২৭ সাল থেকে সেখানে মাঝারি আকারের ট্রাক তৈরি শুরু করতে চায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিনিয়োগগুলো মূলত বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণ বা পুরনো কারখানা পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে – এমনটা বলার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পে বিনিয়োগের একটি বৃহত্তর চিত্র।
বিশেষ করে, বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
গবেষণা সংস্থা আটলাস পাবলিক পলিসি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিগুলো ইভি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রায় ২০৮.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২২ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং এর ফলে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিনিয়োগের পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন কর্তৃক প্রণীত দুটি আইন – বাইপার্টিজান অবকাঠামো আইন এবং ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট।
এই আইনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে ফেডারেল প্রণোদনা সরবরাহ করছে।
তবে, হোয়াইট হাউস বাইডেন প্রশাসনের এই বিনিয়োগের পরিমাণকে কম করে দেখিয়েছে।
তারা এমন কিছু খবর তুলে ধরেছে যেখানে দেখা যায়, কিছু গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা তাদের ইভি তৈরির পরিকল্পনা স্থগিত করেছে বা পিছিয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পে বিনিয়োগের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে স্বল্প মেয়াদে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নতুন কারখানা তৈরি করতে বা বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
তাই, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলো শেষ পর্যন্ত কতটুকু সফল হবে, তা এখনই বলা কঠিন।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা