বাংলার আকাশে উড়তে থাকা বিশাল এক পাখি, “হাড়গিলা” (Hargila)। একসময় যাদের কদর ছিল না বললেই চলে, মানুষের ঘৃণার শিকার হতে হতো, সেই হাড়গিলারাই এখন ভারতের আসাম ও বিহার রাজ্যের নারীদের অনুপ্রেরণা।
এই বিরল প্রজাতির পাখিটিকে বাঁচানোর জন্য এক অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রায় ২০,০০০ নারীর একটি দল, যাদের নাম ‘হাড়গিলা আর্মি’।
আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একসময় হাড়গিলার আনাগোনা ছিল, কিন্তু মানুষের বিরূপ মনোভাবের কারণে এদের সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে।
স্থানীয়রা এদের “নোংরা” এবং “অস্বাস্থ্যকর” হিসেবে বিবেচনা করত, কারণ এরা মূলত আবর্জনা ও মৃতদেহ খেয়ে জীবন ধারণ করে।
এই ধারণা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. পূর্ণিমা দেবী বর্মন। তিনি স্থানীয় নারীদের একত্রিত করে গড়ে তোলেন ‘হাড়গিলা আর্মি’।
পূর্ণিমাদেবীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই পাখির প্রতি স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়।
তিনি গ্রামের নারীদের সাথে মিশে তাদের রান্না প্রতিযোগিতায় উৎসাহিত করেন, শিশুদের সুস্থ জীবনের জন্য প্রার্থনা সভার আয়োজন করেন এবং একইসাথে হাড়গিলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন।
নারীদের স্বাবলম্বী করতে তিনি আসামের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
স্থানীয় সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তাঁত ও সুতা সরবরাহ করা হয়, যেখানে নারীরা হাড়গিলার ছবিযুক্ত কাপড় তৈরি করতে শুরু করেন।
এই কাপড় দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন পোশাক, ব্যাগ এবং কুশন কভার, যা স্থানীয় বাজারে ও অনলাইনে বিক্রি করা হয়।
এর ফলে নারীদের মাসিক আয়েও উন্নতি হয়।
তাঁর এই “উদ্যোক্তা ভাবনা” নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২২ সালে ইউএনইপি-র (UNEP) ‘আর্থ চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার লাভ করেন।
শুধু আসামেই নয়, প্রতিবেশী রাজ্য বিহারেও হাড়গিলার দেখা মেলে।
সেখানে পাখিবিদ অরবিন্দ মিশ্র ২০০৬ সালে প্রথম এই পাখির সন্ধান পান এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় এদের সংরক্ষণে কাজ শুরু করেন।
স্থানীয়দের মধ্যে হাড়গিলাকে নিয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে তিনি স্থানীয় পুরোহিতদের সাহায্য নেন, যাতে তারা গ্রামবাসীকে বোঝাতে পারেন যে হাড়গিলা তাদের গ্রামে আসাটা সৌভাগ্যের প্রতীক।
হাড়গিলা সংরক্ষণে ‘হাড়গিলা আর্মি’ এবং অন্যান্য সংরক্ষণবিদদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যেখানে একসময় আসামে মাত্র ২৮টি বাসা ছিল, সেখানে এখন ২৫২টির বেশি বাসা তৈরি হয়েছে।
বিহারেও এদের সংখ্যা বাড়ছে।
তবে, এখনো পর্যন্ত এই পাখির জীবনযাত্রা বেশ কঠিন।
আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, এবং কৃষিকাজের প্রসারের কারণে এদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যতে, এই পাখিগুলিকে বাঁচাতে আরও ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন করে পাখির বাসার জন্য গাছ লাগানো হচ্ছে এবং পুরনো জলাভূমিগুলো সংস্কারের চেষ্টা চলছে।
ড. পূর্ণিমা দেবী বর্মন চান, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে হাড়গিলার সংখ্যা ৫,০০০-এ উন্নীত করতে এবং ‘হাড়গিলা আর্মি’র সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করতে।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনে এই পাখির প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক