অনলাইন জুয়ার নামে প্রতারণা: ভিসা ও মাস্টারকার্ডের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
সম্প্রতি, ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মতো বিশ্বখ্যাত দুটি পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, তারা যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে পরিচালিত কিছু জুয়া খেলার ওয়েবসাইটে গ্রাহকদের অর্থ লেনদেনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন এবং তাদের হাজার হাজার পাউন্ড খোয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুটি সংস্থা তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লাইসেন্সবিহীন ওয়েবসাইটে লেনদেন হওয়া বন্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ, তাদের পক্ষ থেকে এমনটা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি ছিল। গত সপ্তাহে, যুক্তরাজ্যের গ্রাহকদের লক্ষ্য করে চালানো হওয়া নয়টি ওয়েবসাইটে ক্যাসিনো গেম এবং লাইভ স্পোর্টস বেটিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল, যেখানে মাস্টারকার্ড এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ ছিল। ভিসা কার্ডের মাধ্যমেও এই ওয়েবসাইটগুলোতে লেনদেন করা যাচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উভয় সংস্থাই সামান্য পরিমাণ ফি লাভ করে থাকে।
অবৈধ জুয়া খেলার সাইটগুলোর সঙ্গে কার্ড কোম্পানিগুলোর এই যোগসূত্র প্রকাশ্যে এসেছে ‘ইনভেস্টিগেট ইউরোপ’ নামক একটি সংস্থার অনুসন্ধানের মাধ্যমে। এই সংস্থাটি ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় থাকা, তবে নিষিদ্ধ, এমন জুয়া খেলার সাইটগুলোর একটি নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করে।
ভুক্তভোগীদের একজন জানিয়েছেন, একটি লাইসেন্সবিহীন সাইটে জুয়া খেলতে গিয়ে তিনি প্রায় ৬ কোটি টাকার বেশি (প্রায় ৬০,০০০ পাউন্ড) হারিয়েছেন, যার ফলস্বরূপ তিনি আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলেন। জার্মানির আদালতে আরও একজন ব্যক্তি সফলভাবে একটি জুয়া খেলার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রায় ২ কোটি টাকার বেশি (প্রায় ২,০০,০০০ পাউন্ড) হারিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি বলেন, “যারা এই ক্যাসিনোগুলো পরিচালনা করে, তারা আমার জীবন কেড়ে নিয়েছে।”
যুক্তরাজ্যে সক্রিয় থাকা এই নয়টি ওয়েবসাইটের কোনোটিরই জুয়া খেলার লাইসেন্স নেই, যা আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। কিন্তু, এগুলো সার্চ রেজাল্টে দেখা যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের প্রচারণা চালানো হয়। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে, সবচেয়ে জনপ্রিয় পাঁচটি সাইটে প্রায় ৪০ লক্ষ বার ভিজিট করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সাইটগুলো গ্রাহকদের জেতার অর্থ পরিশোধ করে না এবং জুয়া খেলার আসক্ত ব্যক্তিদের স্প্যামিং করে। ‘ফ্যাটপাইরেট’ নামক একটি সাইট, যা ৪২৫ পাউন্ড পর্যন্ত বোনাস দেওয়ার ঘোষণা করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবহারকারীদের জেতা অর্থ তুলতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাজ্যের এক গ্রাহক জানিয়েছেন, তিনি ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে প্রায় ৩,২৭০ পাউন্ড খরচ করে ৬,০০০ পাউন্ড জিতেছিলেন, কিন্তু সেই টাকা তিনি তুলতে পারেননি। ‘গ্রানসিনো’ নামক আরেকটি সাইটের গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, জেতার অর্থ তুলতে না পারার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর পর তার অ্যাকাউন্টটি মুছে দেওয়া হয়েছে। গ্রাহক সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা হলে, তাদের জানানো হয় যে বিষয়টি এখানেই শেষ। ওই গ্রাহক জানান, “তারা আপনার টাকা নেয়, কিন্তু কখনোই পরিশোধ করে না।”
অবৈধ ওয়েবসাইটগুলোর পরিচালকরা, যারা দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ভিসা এবং মাস্টারকার্ড জানিয়েছে, তারা তাদের নেটওয়ার্কে অবৈধ কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। যুক্তরাজ্যের জুয়া খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘দ্য গ্যাংবলিং কমিশন’ জানিয়েছে, তারা এই সাইটগুলো সম্পর্কে অবগত এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাগুলো অবৈধ জুয়া খেলার লেনদেন সহজতর করতে পেমেন্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রকদের পক্ষ থেকে সাইটগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জানা গেছে, ‘গ্যাংবলিং কমিশন’ চিহ্নিত করা নয়টি ওয়েবসাইটের মধ্যে অন্তত পাঁচটির বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে। কিন্তু, গত সপ্তাহেও সাইটগুলো সক্রিয় ছিল এবং ইউকে গ্রাহকদের কাছ থেকে কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করছিল। এমনকি, তারা ১,৮০০ পাউন্ড পর্যন্ত ওয়েলকাম বোনাস এবং বিনামূল্যে স্পিনের মতো অফারও দিচ্ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের জুয়া সংস্কার বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির চেয়ারম্যান, আইয়ান ডানকান স্মিথ বলেন, “এই কোম্পানিগুলোকে অবিলম্বে তাদের কার্যক্রম আরও উন্নত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে মাস্টারকার্ড ও ভিসা ‘পেপ্যাল’-এর সঙ্গে মিলে জুয়া খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘গ্যাংবলিং কমিশন’-এর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল, যেখানে তারা লাইসেন্সবিহীন জুয়া খেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট বন্ধ করতে রাজি হয়। কোম্পানিগুলো তাদের নেটওয়ার্ককে অপরাধমূলক কাজের জন্য ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে আইনত বাধ্য। কিন্তু, এই দুটি সংস্থাকে উচ্চ ট্র্যাফিকের অবৈধ ওয়েবসাইটের জন্য পেমেন্ট সুবিধা দিতে দেখা গেছে, যা তাদের যথাযথ তদারকির দুর্বলতা প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, জুয়া খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আসা অভিযোগের রেকর্ড থেকে জানা যায়, ব্রিটেনে অবৈধ জুয়া খেলার বাজার কতটা বিস্তৃত। তথ্যের স্বাধীনতা আইনের অধীনে ‘ইনভেস্টিগেট ইউরোপ’-এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে লাইসেন্সবিহীন জুয়া খেলার সাইটগুলোর বিরুদ্ধে অন্তত ৯২২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি অভিযোগে সরাসরি মাস্টারকার্ড ও ভিসার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি একটি অবৈধ জুয়া খেলার সাইটে প্রায় ৭০,০০০ পাউন্ড জিতেছিলেন, যেখানে মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করা যেত। কিন্তু, তিনি সেই টাকার সামান্য অংশই তুলতে পেরেছিলেন।
আইয়ান ডানকান স্মিথ এই পরিস্থিতিকে “গভীর উদ্বেগের” বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যদিও অনলাইন জুয়া খেলার কারণে হওয়া ক্ষতির বেশিরভাগই লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে, তবুও নিয়ন্ত্রকদের “অবৈধভাবে পরিচালিত সাইটগুলোর অপব্যবহার বন্ধ করতে আরও বেশি কিছু করা উচিত।”
মাস্টারকার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের নেটওয়ার্কে “অবৈধ কার্যকলাপের প্রতি শূন্য সহনশীলতা” রয়েছে। কোনো সমস্যা চিহ্নিত হলে, তারা তা খতিয়ে দেখে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে। ভিসা জানিয়েছে, তাদের নেটওয়ার্কে অবৈধ কার্যকলাপ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। তারা এই ধরনের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং সব অবৈধ কার্যকলাপের তদন্ত করে।
ইউনিভার্সিটি অফ গ্লাসগোর জুয়া খেলার ক্ষতির বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হিদার ওয়ার্ডেল বলেছেন, এই ঘটনাগুলো লাইসেন্সবিহীন জুয়া খেলার পেছনে থাকা “বিস্তৃত এবং জটিল বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম”-এর প্রমাণ। তার মতে, এই শৃঙ্খলের “প্রত্যেক অভিনেতাকে” জবাবদিহি করতে হবে।
গ্যাংবলিং কমিশন জানিয়েছে, তারা অবৈধ বাজারকে দমন করার জন্য কাজ করছে, যার মধ্যে গত ১১ মাসে ৭৭০টির বেশি ‘বন্ধের নোটিশ’ জারি এবং ১ লক্ষের বেশি ইউআরএল গুগল থেকে সরানোর জন্য পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু রোডস এর আগে ‘ফিনিক্সিং’-কে একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফিনিক্সিং হলো, যখন অবৈধ সাইট বন্ধ করার পর সেগুলোর মতো দেখতে নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, গ্রাহকরা তাদের ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করে সহজেই সাইটগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত কিনা, তা যাচাই করতে পারেন। অবৈধ সাইটে জুয়া খেললে গ্রাহকরা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন, কারণ তাদের আর্থিক তথ্য চুরি হতে পারে এবং জেতার পরেও অর্থ নাও পাওয়া যেতে পারে।
‘বেটিং অ্যান্ড গেমিং কাউন্সিল’, যা লাইসেন্সপ্রাপ্ত অপারেটরদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মতে, গ্রেট ব্রিটেনের জুয়াড়িরা প্রতি বছর লাইসেন্সবিহীন সাইটে ২.৭ বিলিয়নের বেশি পাউন্ড খরচ করে থাকে। তারা বলেছে, “অবৈধ এবং ক্রমবর্ধমান জুয়া খেলার কালোবাজার একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি।”
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান