সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আজকাল সবুজ রঙের ক্লোরোফিল মেশানো জল খাওয়ার চল বেশ বেড়েছে। ত্বক আরও উজ্জ্বল হবে, হজমশক্তি বাড়বে, এমনকী শরীরে আরও অনেক শক্তি আসবে—সোশ্যাল মিডিয়ার এইসব স্বাস্থ্য পরামর্শের ভিড়ে অনেকেই আকৃষ্ট হচ্ছেন ক্লোরোফিলের দিকে। কিন্তু সত্যিই কি ক্লোরোফিল জল খাওয়া স্বাস্থ্যকর? আসুন, এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
ক্লোরোফিল আসলে সবুজ রঙের একটি রঞ্জক পদার্থ, যা গাছপালাদের পাতায় পাওয়া যায়। সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করতে ক্লোরোফিল সাহায্য করে, আর এই প্রক্রিয়ার ফলে অক্সিজেন নির্গত হয়। পালং শাক, ব্রোকলি, কিংবা কিউয়ির মতো সবুজ সবজি ও ফলে ক্লোরোফিলের প্রাকৃতিক উৎস বিদ্যমান।
ক্লোরোফিলের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন এর তরল বা বড়ি আকারে সহজলভ্য সাপ্লিমেন্টের (supplement) কথা আসে। তবে, বাজারে উপলব্ধ ক্লোরোফিলের সাপ্লিমেন্ট কিন্তু প্রাকৃতিক ক্লোরোফিলের থেকে কিছুটা ভিন্ন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (UCLA) মেডিসিনের অধ্যাপক এবং পুষ্টিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ ড. বিজয়া সুরমপুদি-র মতে, “সাধারণত ক্লোরোফিলিন নামক ক্লোরোফিলের একটি জল-দ্রবণীয় রূপ ব্যবহার করা হয়, যেখানে তামা ও সোডিয়াম থাকে।” ক্লোরোফিলিন হলো ক্লোরোফিলের একটি কৃত্রিম রূপ, যেখানে প্রাকৃতিক ক্লোরোফিলের মূল ম্যাগনেসিয়াম পরমাণুর বদলে তামা ব্যবহার করা হয়। এর ফলে এটি প্রাকৃতিক ক্লোরোফিলের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল হয়।
১৯৩০-এর দশকে, টেম্পল ইউনিভার্সিটির গবেষক বেঞ্জামিন গ্রাসকিন ক্ষত ও আলসারের চিকিৎসায় ক্লোরোফিলের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। যদিও তাঁর ফলাফল মিশ্র ছিল। ১৯৪০-এর দশকে ক্লোরোফিলকে দুর্গন্ধনাশক এবং ডিটক্সিফায়ার হিসেবে বাজারজাত করা হয়। এরপর টুথপেস্ট, সাবান, এমনকি চুইংগামের মতো বিভিন্ন পণ্যে এর ব্যবহার দেখা যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ক্লোরোফিলের চাহিদা আবারও বেড়েছে। ইউটিউবাররা তাঁদের স্বাস্থ্যবিষয়ক রুটিনে ক্লোরোফিল মেশানো শুরু করেন, এবং বর্তমানে, ইনস্টাগ্রামের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও #HealthTok কমিউনিটির জনপ্রিয়তার কারণে এই অভ্যাস এখন প্রায় সকলের কাছে পরিচিত।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্লোরোফিলের উপকারিতা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। বলা হয়, এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, ব্রণ কমাতে সাহায্য করে, হজমক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরে শক্তি যোগায়। এছাড়াও, শরীরকে ডিটক্সিফাই করা, ওজন কমাতে সহায়তা করা এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক—এমন কিছু বড় দাবিও করা হয়।
তবে, ক্লোরোফিলের উপকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ এখনো খুব বেশি নেই। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত ক্যান্সার চিকিৎসক ড. এলেন কর্নমেহলের মতে, “ক্লোরোফিল মাংস প্রক্রিয়াকরণের সময় উৎপন্ন হতে পারে এমন কিছু সম্ভাব্য কার্সিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) শোষণে বাধা দিতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটি “জিনগত ক্ষতিরোধ করতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে পারে।” অর্থাৎ, ক্লোরোফিল পরিবেশ দূষণ থেকে সৃষ্ট আমাদের জিনের ক্ষতি কমাতে পারে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে কোষের ক্ষতিও প্রতিরোধ করতে পারে।
অন্যদিকে, ক্লোরোফিলের কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। ড. কর্নমেহল সতর্ক করে বলেন, “ক্লোরোফিল আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে, কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং কিছু গবেষণায় টিউমার বৃদ্ধিতে সহায়ক হতেও দেখা গেছে।” এছাড়াও, ক্লোরোফিল সাপ্লিমেন্টে তামার পরিমাণ বেশি থাকলে তা শরীরে তামার বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে।
ক্লোরোফিল জল পানের ফলে ত্বক আরও উজ্জ্বল হয়েছে বলে অনেকেই দাবি করেন। তবে, কেউ কেউ মনে করেন, এর কারণ হলো জল গ্রহণ বাড়ানো এবং শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখা। জল আমাদের হজম ক্ষমতা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং শরীরে শক্তির যোগান দিতে সাহায্য করে।
তাহলে, ক্লোরোফিল গ্রহণের সঠিক মাত্রা কত? সাধারণত, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন তরল ক্লোরোফিলিনের পরিমাণ ১০০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে, মানুষের শরীরে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ড. সুরমপুদি বলেন, “যেহেতু খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) সাপ্লিমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই এর সর্বোচ্চ সীমা জানা কঠিন।” তিনি আরও যোগ করেন, “ক্লোরোফিলিন সাপ্লিমেন্টের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যেমন—পেটের সমস্যা, ত্বকের প্রতিক্রিয়া, এবং অ্যালার্জির সমস্যা।” তাই, কোনো নতুন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার আগে অবশ্যই একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো মহিলাদের জন্য ক্লোরোফিলিনের নিরাপত্তা নিয়ে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি।
ক্লোরোফিলের উপকারিতা পেতে চাইলে খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি যোগ করা সবচেয়ে ভালো উপায়। পালং শাক, কলমি শাক, সরিষা শাক, আলফালফা, পার্সলে, সবুজ বাঁধাকপি, শতমূলী, ক্লোরেলা এবং স্পিরুলিনার মতো খাবারে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোফিল থাকে। এছাড়াও, একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হিসেবে বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ড. কর্নমেহলের মতে, “সবুজ শাকসবজি খাওয়া সবচেয়ে ভালো। এই খাবারগুলোতে বিটা-ক্যারোটিন, লুটেইন, ভিটামিন ই, ফাইবার এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকে, যা স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।”
সুতরাং, ক্লোরোফিলের উপকারিতা পেতে চাইলে সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে সবুজ শাকসবজির দিকে ঝুঁকতে পারেন। যেকোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার আগে অবশ্যই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
তথ্য সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক