নববর্ষের এক আনন্দময় উদযাপন: নওরোজ উৎসব
বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন বছরের সূচনা হয়, আর এই আনন্দময় মুহূর্তটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘নওরোজ’ উৎসবের মধ্য দিয়ে। ইরানসহ বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের কাছে নওরোজ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি নতুন বছর শুরুরও প্রতীক। ফার্সি ভাষায় ‘নওরোজ’-এর অর্থ হলো ‘নতুন দিন’। এটি মূলত বসন্তের আগমনের উৎসব, যা সৌর ক্যালেন্ডার অনুসারে নতুন বছরকে চিহ্নিত করে।
নওরোজের ইতিহাস প্রায় ৩,০০০ বছরের পুরনো। প্রাচীন পারস্যে জরাথুস্ট্রীয় ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই উৎসবের উদ্ভব হয়, যেখানে বসন্তকে অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে আলোর জয় হিসেবে দেখা হতো। সপ্তম শতকে পারস্যে ইসলামি শাসনের বিস্তার ঘটলেও নওরোজ তার স্বকীয়তা হারায়নি। বরং, পারসিকদের অভিবাসনের ফলে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পরে।
নওরোজ উৎসব কিভাবে পালিত হয়?
ঐতিহ্যগতভাবে, নওরোজ পালিত হয় ২১শে মার্চ তারিখে, যখন বসন্তের আগমন ঘটে। তবে উৎসবের প্রস্তুতি চলে অনেক আগে থেকেই। উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই মানুষজন নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে শুরু করে। তারা ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে জলপূর্ণ পাত্র স্থাপন করে। এছাড়া, নওরোজের আগের বুধবার ‘চারশানবে সুরি’ নামে একটি উৎসব পালন করা হয়, যেখানে অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখতে আগুন জ্বালানো হয় এবং চামচ দিয়ে দরজায় আঘাত করা হয়। অনেকে কবরস্থানে গিয়ে মৃতের আত্মার শান্তি কামনা করে এবং তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ নিবেদন করে।
নওরোজ উৎসব মূলত উর্বরতা ও নতুন জীবনের প্রতীক। তাই এই উৎসবে শস্যদানা ও ডিমের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নওরোজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘হাফ্ট-সিন’ নামক একটি টেবিল সাজানো। ‘হাফ্ট’ মানে ‘সাত’ এবং ‘সিন’ হলো ফার্সি বর্ণমালার একটি অক্ষর। এই টেবিলে রাখা হয় এমন সাতটি জিনিস, যেগুলোর নাম ‘সিন’ অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। এই জিনিসগুলো হলো: অঙ্কুরিত শস্য (নতুন জীবনের প্রতীক), সেঞ্জেদ (ভালোবাসা জাগানোর প্রতীক), রসুন (সুরক্ষার প্রতীক), আপেল (উর্বরতার প্রতীক), সুমাক (ভালোবাসার প্রতীক), ভিনেগার (ধৈর্যের প্রতীক) এবং সামানু (উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক)। এছাড়াও, এই টেবিলে কোরআন, ডিম, আয়না এবং কবিতা রাখা হয়। যদিও নওরোজের ঐতিহ্য অনেক পুরনো, ‘হাফ্ট-সিন’ টেবিলের ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন, যা গত শতাব্দীর একটি সংযোজন।
বর্তমানে নওরোজ উৎসব
আধুনিক যুগেও নওরোজ তার গুরুত্ব হারায়নি। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর নতুন সরকার এই উৎসবকে তাদের ধর্মীয় শাসনের বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করে এর উদযাপন বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। বর্তমানে ইরানসহ বিভিন্ন দেশে নওরোজ রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়।
নওরোজ এখন আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আজারবাইজান, জর্জিয়া, ইরাকের কুর্দিস্তান, কাজাখস্তান, কসোভো, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়ার বায়ান-ওলগি প্রদেশ, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তানেও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এছাড়াও, তুরস্ক, ভারতসহ আরও অনেক দেশে এই উৎসবের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, যেখানে পারসিক সংস্কৃতির প্রভাব বিদ্যমান।
জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) ২০০৯ সালে নওরোজকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কো মনে করে, এই উৎসব “প্রজন্ম এবং পরিবারের মধ্যে শান্তি ও সংহতি, সেইসাথে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ককে উৎসাহিত করে”। ২১শে মার্চ আন্তর্জাতিক নওরোজ দিবস হিসেবেও পালিত হয়, যদিও ক্যালেন্ডার ও ঋতু পরিবর্তনের হিসাব অনুযায়ী নওরোজের উৎসব ১৯ থেকে ২২শে মার্চের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়।
তথ্য সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক