মৃগীরোগের চিকিৎসায় নতুন আশা: মস্তিষ্কের উন্নত স্ক্যান পদ্ধতির উদ্ভাবন
বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মৃগীরোগে আক্রান্ত। এই রোগের চিকিৎসায় ওষুধ সেবন একটি সাধারণ পদ্ধতি, তবে অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই ওষুধ কাজ করে না।
যুক্তরাজ্যের প্রায় ১ লক্ষ মানুষের মৃগীরোগ, প্রচলিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। তাদের জন্য অস্ত্রোপচারই একমাত্র ভরসা। তবে, মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ক্ষত চিহ্নিত করতে সমস্যা হওয়ায় অনেক সময় অস্ত্রোপচারও কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি, যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ এবং প্যারিসের গবেষকরা একটি অত্যাধুনিক মস্তিষ্কের স্ক্যান পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা এই সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে। নতুন এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ৭টি (7T) এমআরআই স্ক্যানার মস্তিষ্কের আরও বিস্তারিত ছবি তোলে, যা ক্ষুদ্র ক্ষতগুলো সনাক্ত করতে বিশেষভাবে কার্যকর।
প্রচলিত ৩টি (3T) স্ক্যানারের তুলনায়, এই উন্নত প্রযুক্তির স্ক্যানার মস্তিষ্কের গভীরের ক্ষতগুলো আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম।
গবেষকরা মস্তিষ্কের চারপাশে আটটি ট্রান্সমিটার ব্যবহার করেছেন, যা “প্যারালাল ট্রান্সমিট” (parallel transmit) ইমেজিং তৈরি করে। এর ফলে স্ক্যান করার সময় “ডার্ক প্যাচ” বা কালো দাগ আসার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উলফসন ব্রেইন ইমেজিং সেন্টার এবং প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন।
একাধিক রোগীর ওপর এই নতুন পদ্ধতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে। এই পদ্ধতিতে স্ক্যান করার পর, ৩১ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি গবেষণা চালানো হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ৭টি (7T) স্ক্যানার ব্যবহার করে আগে শনাক্ত করা যায়নি এমন মস্তিষ্কের ক্ষত ৯ জন রোগীর ক্ষেত্রে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া, ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রচলিত স্ক্যানিং পদ্ধতির চেয়ে এই নতুন পদ্ধতির ছবিগুলো আরও স্পষ্ট ছিল।
ফলাফলস্বরূপ, এই স্ক্যানিং পদ্ধতির মাধ্যমে ১৮ জন রোগীর চিকিৎসার ধরন পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জনকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, একজনকে লেজার ইন্টারস্টিসিয়াল থার্মাল থেরাপি এবং ৫ জনকে স্টেরিওট্যাকটিক ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (sEEG) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ড. থমাস কোপ বলেন, “যেসব মৃগীরোগীর খিঁচুনি ঔষধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তাদের জীবনযাত্রায় এর গুরুতর প্রভাব পড়ে। এই রোগীদের স্বাধীনতা এবং কর্মজীবনেও এটি বাধা সৃষ্টি করে।
আমরা জানি, এই রোগীদের সুস্থ করার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার জন্য মস্তিষ্কের সঠিক স্থান চিহ্নিত করা জরুরি।” তিনি আরও যোগ করেন, “নতুন এই প্রযুক্তির কারণে আরও বেশি মৃগীরোগী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারবেন।”
এপিলিপসি সোসাইটির মেডিকেল ডিরেক্টর, ড. লে স্যান্ডার এই উদ্ভাবনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “যে কোনো প্রযুক্তি, যা ওষুধে ভালো হয় না এমন মৃগীরোগের রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে, তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।”
যদিও এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখনো বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়, তবে ভবিষ্যতে এর ব্যবহার মৃগীরোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান