ভারতে মুসলিম ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বিতর্ক: ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ কি অরক্ষিত?
নয়াদিল্লি, ভারত – দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থিত মুসলিম সম্প্রদায়ের ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বর্তমানে বিতর্ক চলছে। ধারণা করা হয়, এসব সম্পত্তির সম্মিলিত মূল্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়াকফ হলো মুসলিমদের ধর্মীয় ও দাতব্য উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা সম্পত্তি, যেমন মসজিদ, কবরস্থান, স্কুল এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক স্থান।
সম্প্রতি, এসব সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের উজ্জয়িনীতে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
উজ্জয়িনীর ঘটনা:
মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে একটি সরকারি প্রকল্পের জন্য সম্প্রতি ওয়াকফ বোর্ডের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জানা যায়, এই জমিটিতে একটি পুরনো মসজিদ এবং আরও কিছু স্থাপনা ছিল, যা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ ওয়াকফ আইনের পরিপন্থী। তাদের মতে, সরকার এই জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষতি করছে।
ওয়াকফ আইন এবং সংশোধনী:
ভারতে ওয়াকফ সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য ১৯৫৪ সালে একটি আইন (Waqf Act) তৈরি করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে এই আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৯৫ ও ২০১৩ সালে।
তবে, বর্তমানে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এই আইনে নতুন কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোতে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা কমানো এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিরোধীরা মনে করেন, এর মাধ্যমে সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি কুক্ষিগত করতে চাইছে।
অতীতের সমস্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি:
ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘকাল ধরে নানা ধরনের সমস্যা চলে আসছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দুর্নীতি এবং জমির সঠিক হিসাব না থাকার কারণে অনেক সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে।
স্থানীয় ভূমি অফিসের পুরাতন রেকর্ড এবং ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণে ত্রুটির কারণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, উজ্জয়িনীর একটি পুরাতন গেজেটে ১,০১৪টি ওয়াকফ সম্পত্তির কথা উল্লেখ করা হলেও, ভূমি অফিসের রেকর্ডে সেগুলোর অনেকগুলোকেই হয় সরকারি সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অথবা সেগুলোর কোনো হিসাব নেই।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
বিরোধী দলগুলো সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছে। তাদের মতে, সরকার সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছে। তবে, ক্ষমতাসীন বিজেপি’র নেতারা বলছেন, এই সংশোধনীগুলো ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত:
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মতে, নতুন আইন এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
উপসংহার:
ভারতে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিতর্কটি একটি জটিল বিষয়। একদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনার উন্নতির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে, সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন উঠেছে। এই বিতর্কের সমাধান না হলে, ওয়াকফ সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা