গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আহত শিশুদের অঙ্গহানি, সংকট আর সাহায্য-সহযোগিতার অভাব।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত শিশুদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। শরীরের অঙ্গ হারিয়ে তারা একদিকে যেমন শারীরিক কষ্টের শিকার, তেমনি মানসিক আঘাতও তাদের বিপর্যস্ত করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে আহত শিশুদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যানুসারে, গাজায় শিশুদের অঙ্গহানির ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
পাঁচ বছর বয়সী সিলার (Sila) কথা ভাবুন। ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার একটি পা মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়, যার ফলস্বরূপ অস্ত্রোপচার করে সেটি কেটে ফেলতে হয়। এরপর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে সে যখন একটি কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটা শেখার চেষ্টা করছে, তখনো তার চোখে-মুখে গভীর কষ্ট। তার মতো আরও হাজারো শিশুর জীবনে নেমে এসেছে এই দুঃসহ যন্ত্রণা। কারো বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই মারা গেছে, কারো বা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।
গাজার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ওচা (OCHA) একে আধুনিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু অঙ্গহীন’ হওয়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী, পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং অন্যান্য সহায়তার তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। যদিও যুদ্ধ বিরতির সময় কিছু ত্রাণ সামগ্রী এসেছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।
চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে অনেক শিশুর অঙ্গহানি হয়েছে, যা সহজে সারানো সম্ভব ছিল। চিকিৎসকরা বলছেন, সংক্রমণের কারণে তাদের অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
১১ বছর বয়সী রীমের (Reem) কথা ভাবুন। একটি বিমান হামলায় তার হাত হারিয়েছে, এখন সে নিজের জামাকাপড় পরতে পারে না, চুল বাঁধতে পারে না, এমনকি জুতোও বাঁধতে পারে না। মায়ের কাছে অসহায় হয়ে সে শুধু অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকেরই ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
গাজায় প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার শিশু অঙ্গহানির শিকার হয়েছে, যাদের পুনর্বাসন জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৭,৫০০ শিশু ও বয়স্ক মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, যাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে অনেক শিশুর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো আহত শিশুদের সহায়তার জন্য কাজ করছে। কিন্তু তাদের কার্যক্রমও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে। ইসরায়েল বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পুনর্বাসন সামগ্রী সরবরাহ করতে বাধা দেয়। এমনকি অনেক সময় কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদানও গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
কিছু শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে সেই প্রক্রিয়া খুবই ধীর গতিতে চলছে। হাজার হাজার রোগী এখনো চিকিৎসার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। শিশুদের এই দুর্দশা দেখে তাদের পরিবারগুলো অসহায় বোধ করছে। তারা চায়, তাদের সন্তানদের ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা হোক, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (Associated Press)