আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্র নির্মাতা মার্কো বার্গারের সিনেমাগুলো প্রায়শই দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক ও যৌনতার জটিলতা নিয়ে। তাঁর ছবিগুলো একদিকে যেমন পুরুষদের মধ্যকার বন্ধুত্ব, গোপন বাসনা, এবং সমাজের চাপকে তুলে ধরে, তেমনই সমকামিতার ধারণাটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তাঁর ছবি ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনট লাভার্স’ (The Astronaut Lovers) তেমনই একটি উদাহরণ।
বার্গারের সিনেমায় গ্রীষ্মকালের প্রেক্ষাপট প্রায়ই দেখা যায়, যেখানে আকর্ষণীয় তরুণদের একটি দল ছুটি কাটাতে আসে। এই ধরনের পরিবেশে, লুকানো আকাঙ্ক্ষা, পুরুষালি আচরণ, এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন—এসব বিষয়গুলো বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
বার্গার মনে করেন, সমাজ যৌনতাকে কিছু নির্দিষ্ট খাতে বিভক্ত করে, কিন্তু মানুষের আকর্ষণ সবসময়ই বহমান। তাঁর কাজগুলো এই ধারণাকেই সমর্থন করে।
বার্গারের নতুন ছবি ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনট লাভার্স’-এ দেখা যায়, দুই বন্ধুর মধ্যে ভালোবাসার একটি কৌতুকপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ছবিতে অভিনেতা হাভিয়ের ওড়ান এবং লাউতারো বেত্তোনি’র অভিনয় দর্শকদের মন জয় করেছে।
ছবিটি ভালোবাসার চিরাচরিত ধারণাকে ভেঙে দেয় এবং একটি কাল্পনিক প্রেমের গল্পকে তুলে ধরে, যা দর্শককে নতুন কিছু ভাবতে উৎসাহিত করে। বার্গার জানান, তিনি এমন একটি প্রেমের ছবি বানাতে চেয়েছিলেন যেখানে দুই পুরুষের মধ্যেকার সম্পর্ক দেখানো হবে, কারণ এমন ধরনের সিনেমা খুব একটা দেখা যায় না।
তাঁর মতে, এটি একটি রাজনৈতিক বিবৃতিও বটে। কমেডি ঘরানার মাধ্যমে তিনি এমন সব বিষয় তুলে ধরেন যা হয়তো অন্যভাবে বলতে সাহস পেতেন না।
তবে, বার্গারের সিনেমার বিষয়বস্তু এবং নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে আসে। তিনি জানান, চলচ্চিত্র জগতে এখনো কিছু ক্ষেত্রে সমকামিতা-বিষয়ক ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থায়নের সমস্যা হয়।
অনেক প্রযোজক, বিশেষ করে বড় প্রযোজকরা, এই ধরনের ছবি প্রযোজনা করতে দ্বিধা বোধ করেন। তাঁদের মধ্যে এই ধরনের ছবি ‘গে ফিল্ম’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার একটা ভয় কাজ করে।
বার্গারের মতে, তাঁর নির্মিত ১২টি সিনেমার নির্মাণ ব্যয়, অন্য কোনো পরিচালকের একটি সিনেমার চেয়েও কম।
বার্গারের মতে, তাঁর কাজগুলো সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যেখানে পুরুষতান্ত্রিকতা এবং যৌনতার প্রচলিত ধারণাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর সিনেমাগুলো অনেক দর্শকের মনে এই প্রশ্ন তোলে যে, তাঁরাও হয়তো গে হতে পারেন।
বার্গারের কাজের অনুপ্রেরণা আসে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকে। তিনি বুয়েনস আইরেসে বেড়ে ওঠেন এবং ১৮ বছর বয়সে নিজের সমকামিতার কথা প্রকাশ করেন।
তাঁর পরিবারে প্রথমে এই বিষয়টি ভালোভাবে নেওয়া হয়নি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে আরও বেশি আগ্রহী করে তোলে।
বার্গারের মতে, তিনি সব সময় খাঁটি ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
মার্কো বার্গারের সিনেমাগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে এবং দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। তাঁর ছবিগুলো শুধু বিনোদনই দেয় না, বরং সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তোলে।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান