যুক্তরাষ্ট্রে নতুন গাড়ির কারখানা স্থাপন নিয়ে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া তথ্যের সত্যতা কতটুকু? সম্প্রতি এমন একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত উঠে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর নীতির কারণে দেশটিতে গাড়ির কারখানা নির্মাণের হার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবিটি অতিরঞ্জিত।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা তাদের বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো বা পুরোনো কারখানা পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই বিষয়টিকে ট্রাম্প তাঁর সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরলেও, বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণরূপে নতুন কারখানা নির্মাণের পর্যায়ে পড়ে না।
বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে সম্প্রতি ঘোষিত কয়েকটি বিনিয়োগ পরিকল্পনার দিকে নজর রাখা যাক। দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি হুন্দাই, জর্জিয়ার মেটাপ্ল্যান্টে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বছরে ৩ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে, তারা আলাবামার কারখানায়ও উৎপাদন বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
এছাড়া, হুন্দাই প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে লুইজিয়ানায় একটি ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের স্টিল প্ল্যান্ট তৈরির প্রকল্পও রয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানি কোম্পানি হোন্ডা, মেক্সিকোর পরিবর্তে ইন্ডিয়ানাতে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সিভিক হাইব্রিড গাড়ি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও হোন্ডা প্রথমে মেক্সিকোতে এই গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেছিল, তবে এখন তারা বিদ্যমান একটি কারখানায় ২০২৮ সালের মে মাস থেকে বছরে ২ লক্ষ ১০ হাজার সিভিক হাইব্রিড তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এছাড়াও, ক্রিসলার, জিপ ও ফিয়াট-এর মতো গাড়ির ব্র্যান্ডের মালিকানা স্বত্বাধিকারী ডাচ কোম্পানি, স্টেলান্টিস, ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ইলিনয়ের বেলভিডিয়ারে একটি অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা। এই কারখানায় ২০২৩ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো মূলত বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলোর সম্প্রসারণ, যা ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। টরন্টোর ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেসের অধ্যাপক দিমিত্রি আনাস্তাকিসের মতে, “কারখানা স্থাপনার পরিকল্পনা কয়েক বছর আগে থেকেই নেওয়া হয়।”
তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) উৎপাদনে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গবেষণা সংস্থা আটলাস পাবলিক পলিসি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইভি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কোম্পানিগুলো প্রায় ২০৮.৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর ফলস্বরূপ, প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিনিয়োগের পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ‘দ্বিদলীয় অবকাঠামো আইন’ এবং ‘মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন’-এর মতো সরকারি প্রণোদনা। এই আইনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।
তবে, ট্রাম্প প্রশাসন বাইডেন সরকারের এই বিনিয়োগের গুরুত্বকে খাটো করে দেখিয়েছে। তাদের মতে, ‘মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন’ এবং ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’-এর অধীনে বিনিয়োগের প্রায় ৪০ শতাংশ হয় স্থগিত করা হয়েছে, অথবা বিলম্বিত হয়েছে।
গাড়ি প্রস্তুতকারক কিছু কোম্পানির ইভি প্রকল্প বাতিল করার উদাহরণও ট্রাম্প প্রশাসন তুলে ধরেছে। এক্ষেত্রে ভলভো, ফোর্ড এবং মার্সিডিজ-বেঞ্জ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একটি কারখানা তৈরি করতে বা বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই, ট্রাম্পের এই দাবি এখনই চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা