শিরোনাম: কেন কিফের বিচিত্র জগৎ: রং আর কল্পনার মিশেলে এক নতুন শিল্পদৃষ্টি
ব্রিটিশ শিল্পী কেন কিফের (Ken Kiff) শিল্পকর্ম বর্তমানে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের একজন উজ্জ্বল শিল্পী হিসেবে পরিচিত কিফ, বিমূর্ততা এবং চিত্রের এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তাঁর কাজে।
তাঁর ছবিতে রং এবং কল্পনার এক অদ্ভুত জগৎ তৈরি হয়, যেখানে মানুষের মুখাবয়ব এলোমেলো হয়ে যায়, পশুরা পাহাড়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, আর স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো একাকী পথ চলে।
শিল্পী হিসেবে কিফের নিজস্ব একটা জগৎ ছিল, যেখানে তিনি প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের আনন্দ-বেদনাকে নিজস্ব ঢঙে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাজে প্রায়ই দেখা যায় পাখি, গিরগিটি, পাহাড়, জল এবং দেবী-সদৃশ নারীমূর্তি।
এছাড়াও, একটি ছোট আকারের চরিত্র “লিটল ম্যান” (Little Man) প্রায়ই তাঁর ছবিতে দেখা যায়, যাঁর শরীর প্লাস্টিসিনের মতো নরম এবং ভঙ্গুর, যিনি একাকী পথ চলেন।
কিফের শিল্পকর্ম শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কল্পনার জগৎই তুলে ধরে না, বরং তা জীবনের গভীরতাকেও স্পর্শ করে।
বর্তমানে লন্ডনের হ্যালস গ্যালারিতে (Hales Gallery) কেন কিফের কাজের একটি প্রদর্শনী চলছে, যার নাম “কেন কিফ: দ্য ন্যাশনাল গ্যালারি প্রজেক্ট”। এই প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ করে, ১৯৯২-৯৩ সালে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে (National Gallery) “সহযোগী শিল্পী” হিসেবে কাজ করার সময় তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তা এখানে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে।
ন্যাশনাল গ্যালারিতে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা ছিল কিফের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই গ্যালারিটি ছিল ঐতিহ্যপূর্ণ এবং প্রভাবশালী।
কিফের কন্যা আনা কিফের মতে, তাঁর বাবা সবসময়ই শিল্পের চিরাচরিত ধারণার বাইরে কিছু করতে চেয়েছেন।
গ্যালারিতে কাজ করার সময় কিফ পুরনো মাস্টারদের শিল্পকর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নিতেন। তিনি রুপেন্স, ভ্যান গখ, রেমব্রান্ট, পিসানেলো এবং জিওভানি ডি পাওলোর মতো শিল্পীদের কাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
তাঁদের কাজের “সারমর্ম” খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ, রুপেন্সের আঁকা গাছগুলি তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করত।
তাঁর কাজে, পুরনো মাস্টারদের শিল্পকর্মের প্রভাব সুস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, জিওভানি ডি পাওলোর “সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট রিটার্নিং টু দ্য ডেজার্ট” (Saint John the Baptist Retiring to the Desert) ছবিটির বিষয় এবং উপাদানগুলি কিফের নিজস্ব শৈলীর সঙ্গে মিলে যায়।
এছাড়া, বেলিানির “দ্য অ্যাস্যাসেশন অফ সেন্ট পিটার মার্টায়র” (The Assassination of Saint Peter Martyr) ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি “ওম্যান ওয়াচিং আ মার্ডার” (Woman Watching a Murder) তৈরি করেন, যেখানে নীল রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
কিফের কাজের একটি বৈশিষ্ট্য হলো রঙের ব্যবহার। তিনি রংকে তাঁর শিল্পের কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করতেন।
তাঁর ছবিতে বিমূর্ততা এবং চিত্রের মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখা যায়। রাতের গভীরতা বা মানসিক চিন্তাগুলো তাঁর ছবিতে বিভিন্ন রূপে ফুটে ওঠে।
প্রদর্শনীতে কিফের আঁকা ছবি ছাড়াও তাঁর তৈরি করা কিছু প্রিন্টও রয়েছে। এই প্রিন্টগুলোতে ন্যাশনাল গ্যালারিতে কাজ করার সময়ের স্মৃতি এবং প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায়।
কেন কিফের শিল্পকর্ম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁর কাজে বিমূর্ততা এবং চিত্রের এক চমৎকার মিশ্রণ রয়েছে, যা তাঁদের আকৃষ্ট করে।
তাঁর কাজের মাধ্যমে, শিল্পী জীবনের আনন্দ-বেদনা এবং গভীরতা সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান