বোনোবোদের ভাষা: মানুষের মতোই শব্দ ব্যবহারের ক্ষমতা?
বোনোবো, যা আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়দের মধ্যে অন্যতম, তাদের ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা নিয়ে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে এই প্রজাতির বানররা মানুষের মতোই শব্দ ব্যবহারের জটিল কৌশল জানে, যা আগে কেবল মানুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবেই ধরা হতো।
এই আবিষ্কারের ফলে ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্ম নিচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মেলিসা বার্থেটের নেতৃত্বে একটি দল কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ৩০টি প্রাপ্তবয়স্ক বোনোবোর ৭০০-এর বেশি শব্দ বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখেছেন, বোনোবোরা বিভিন্ন ধরনের শব্দ একত্রিত করে এমন বাক্য তৈরি করতে পারে, যার অর্থ কেবল শব্দগুলোর মিলিত রূপের চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
মানুষের ভাষায় যেমন, ‘সোনালী কেশের নর্তকী’ বললে আমরা বুঝি এমন একজন মানুষ, যার সোনালী চুল এবং যিনি নাচেন। কিন্তু ‘খারাপ নর্তকী’ বললে, খারাপ ও নর্তকী – এই দুটি শব্দের সরাসরি অর্থ যোগ করলে যে মানে দাঁড়ায়, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু বোঝায়।
খারাপ শব্দটি এখানে ‘নর্তকী’ শব্দটির অর্থ পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বোনোবোরা প্রধানত সাত ধরনের শব্দ ব্যবহার করে এবং তারা ১৯টি ভিন্ন উপায়ে শব্দগুলো একত্রিত করতে পারে। এর মধ্যে ১৫টি সংমিশ্রণ এখনো বিশ্লেষণের অপেক্ষায়, তবে ৪টি সংমিশ্রণ মানুষের ভাষার মতোই অর্থ তৈরি করে।
উদাহরণস্বরূপ, ‘ইয়েল্প’ নামক একটি শব্দ, যার অর্থ সম্ভবত ‘এসো, এটা করি’ এবং ‘ঘ্রান্ট’ নামক শব্দের অর্থ ‘আমি এটা করছি, দেখ’ – এই দুটি শব্দ একসাথে ব্যবহার করে ‘ইয়েল্প-ঘ্রান্ট’ তৈরি করা হয়, যার অর্থ সম্ভবত ‘এসো, আমি যা করছি, সেটাই করি’। এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে তারা সম্ভবত অন্যদের রাতে বাসা তৈরি করতে উৎসাহিত করে।
অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে শব্দগুলোর সংমিশ্রণ তাদের নিজস্ব অর্থের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ইঙ্গিত বহন করে।
যেমন, ‘পিপ’ (আমি এটা করতে চাই) এবং ‘হুইসেল’ (আমরা একসাথে থাকি) শব্দ দুটি একসাথে ব্যবহার করে ‘পিপ-হুইসেল’ তৈরি করা হয়। এই সংমিশ্রণটি সম্ভবত উত্তেজনাপূর্ণ সামাজিক পরিস্থিতিতে, যেমন মিলনের সময় বা ক্ষমতার প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়, যা শান্তির বার্তা দিতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, বোনোবোদের এই ক্ষমতা আবিষ্কারের ফলে মানুষের ভাষা বিবর্তনের ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কারণ, এই গবেষণার আগে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও একই ধরনের ক্ষমতা দেখা গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভাষার এই জটিলতা তৈরির মূল ভিত্তি অন্তত ৭০ লক্ষ বছর আগে থেকেই তৈরি হয়েছে।
ড. সাইমন টাউনসেন্ড, যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন, বলেছেন, “আমার মনে হয়, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার।”
এই গবেষণা একদিকে যেমন বোনোবোদের বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ, তেমনি মানুষের ভাষার উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনেও সহায়ক হবে।
ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণাগুলো ভাষা এবং যোগাযোগের বিবর্তন সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দিতে পারে।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান