বাঙ্গলার রঙ্গমঞ্চে এক নতুন আলো: হাস্যরসের মোড়কে নারীবাদ
নারীর জীবন, সমাজের চাপ, আর বিয়ের চিরাচরিত ধারণা – এই বিষয়গুলো নিয়ে হাস্যরসের মোড়কে এক অভিনব উপস্থাপনা নিয়ে এসেছেন ব্রিটিশ কমেডিয়ান রোজালি মিনিত। তার সৃষ্টি ‘ক্লেমেন্টাইন’ চরিত্রটি এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। জেন অস্টেন-এর উপন্যাসের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও, ক্লেমেন্টাইনের গল্প বর্তমান সমাজের নারীদের প্রতিচ্ছবি। মিনিতের এই চরিত্র শুধু বিনোদনই জোগায় না, বরং নারীদের আত্ম-অনুসন্ধান এবং সামাজিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে।
রোজালি মিনিত, যিনি নিজেও একজন লেখক ও অভিনেত্রী, ক্লেমেন্টাইন চরিত্রটি তৈরি করেছেন ২০২০ সালের লকডাউনের সময়। চারপাশের অস্থিরতা ও নিজের আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে মুক্তি খুঁজতেই তিনি এই চরিত্রের জন্ম দেন। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট মিনিত শুরুতে একটি বারে কাজ করতেন, পরে একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে এবং একটি দাতব্য সংস্থায়ও কাজ করেছেন। চাকরি হারানোর পর তিনি যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখনই ক্লেমেন্টাইনের ধারণা তার মাথায় আসে। মিনিত বলেন, “আমি সবসময় ইতিহাস ভালোবাসি, তবে সেই সময়ে ‘গার্লবস’ ইতিহাসের ধারণা প্রচলিত ছিল। অ্যানা বোলেইন ছিলেন একজন ‘গার্লবস’, এমনটা ভাবা হতো। কিন্তু আমি এমন একটি ঐতিহাসিক চরিত্র চেয়েছিলাম যে কিছুটা নিস্তেজ এবং নিজের যুগের পিতৃতন্ত্রের ফাঁদে আটকে আছে।”
ক্লেমেন্টাইনের গল্পে, আঠারো শতকের এক নারীর ২১ শতকের জীবনযাত্রা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চরিত্রের পোশাক, সংলাপ, এবং ঘটনার মধ্যে হাস্যরস বজায় রেখে মিনিত নারীত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। চরিত্রটি একদিকে যেমন পুরনো দিনের আদলে তৈরি, তেমনই আধুনিক জীবনের প্রতিচ্ছবিও বহন করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বর্তমান সময়ের নারীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, সবকিছুই ক্লেমেন্টাইনের গল্পে হাস্যরসের মোড়কে পরিবেশিত হয়। মিনিত মনে করেন, “আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে মানুষ বর্তমানকে ভালোবাসতে পারে না। তারা হয় ভবিষ্যতের দিকে অথবা কল্পনার জগতে পালাতে চায়। আর আমরা সবকিছুকে রোমান্টিক করে তুলছি। আমি এটা দেখে মুগ্ধ হই। তাই, ভালোবাসা নিয়ে মানুষের অসন্তুষ্টির সাথে এই ধারণাগুলো মিশে একটি অদ্ভুত এবং জটিল শো তৈরি করেছে।”
‘ক্লেমেন্টাইন’-এর মঞ্চায়ন প্রথম দর্শকদের মন জয় করে ২০২০ সালে, এডিনবার্গ ফ্রিন্জ উৎসবে। এরপর লন্ডনের সোহো থিয়েটারেও এটি দারুণ প্রশংসিত হয়। মিনিত বলেন, “ক্লেমেন্টাইন-এর চরিত্রটি তৈরি করার সময় আমি দর্শকদের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। এটা মেয়েলি, শিশুর মতো, নারীত্ব নিয়ে, কিন্তু এতে কোনো যৌনতা নেই। এটা নিছকই মজার।”
বর্তমানে, মিনিত ‘ক্লেমেন্টাইন’ চরিত্রটিকে নিয়ে ইউকে-জুড়ে সফরে বের হয়েছেন। তিনি জানান, এই সফরের জন্য তাকে বেশ কয়েকটি কাজ করতে হচ্ছে, যাতে তিনি খরচ সামলাতে পারেন। এমনকি তার মা-ও এই সফরে তাকে সাহায্য করছেন। মিনিত মনে করেন, কমেডি জগতে নারীদের জন্য জায়গা করে নেওয়াটা সহজ নয়। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, মানুষ এমন কিছু পছন্দ করে না যা ‘চিক-লিট’-এর মতো মনে হয়। সম্ভবত সে কারণেই ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ কেউ আমার কাজকে সেভাবে গ্রহণ করে না।”
ভবিষ্যতে মিনিত ক্লেমেন্টাইনকে নিয়ে আরও কাজ করতে চান। তিনি চরিত্রটিকে একটি বিপ্লবী গল্পের মোড়কে উপস্থাপন করতে আগ্রহী, যেখানে ফরাসি বিপ্লবের প্রেক্ষাপট থাকবে। তিনি আরও চান ক্লেমেন্টাইন যেন কোনো শহরে যায় এবং সেখানকার ডিকেন্সীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়। মিনিতের মতে, “আমি এমন কিছু তৈরি করতে চাই যা মজাদার এবং হাস্যকর। এটাই আমার প্রধান লক্ষ্য।”
রোজালি মিনিতের ‘ক্লেমেন্টাইন’ চরিত্রটি শুধু একটি কমেডি শো নয়, এটি নারীবাদ, সামাজিক চাপ, এবং আত্ম-অনুসন্ধানের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। মিনিতের এই কাজটি প্রমাণ করে, হাস্যরসের মাধ্যমেও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা যায়।
তথ্য সূত্র: The Guardian