মহাকাশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক আবিষ্কারে, বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথের অভ্যন্তরে আসা কিছু রহস্যময় রেডিও তরঙ্গের উৎস খুঁজে বের করেছেন। জানা গেছে, এই তরঙ্গগুলো আসলে একটি মৃত তারা থেকে আসছে, যা একটি ছোট, শীতল লাল বামন তারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আবর্তিত হচ্ছে। এই যুগল তারার মিথস্ক্রিয়াই তৈরি করছে এই বিরল ঘটনা।
সম্প্রতি ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা এই যুগল তারার সন্ধান পেয়েছেন, যাদের একত্রে ILTJ1101 নামে ডাকা হয়। পৃথিবী থেকে ১,৬০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নক্ষত্রগুলি একে অপরের চারপাশে মাত্র ১২৫.৫ মিনিটে একবার প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কারের ফলে মহাকাশে রেডিও তরঙ্গ নির্গত করা নক্ষত্রদের সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে, বিজ্ঞানীরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে আসা কিছু রেডিও সংকেত শনাক্ত করছিলেন, যা প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর পাওয়া যাচ্ছিল। এই সংকেতগুলো প্রায় ৩০ থেকে ৯০ সেকেন্ড স্থায়ী হতো এবং বৃহত্তর মক্ষপুঞ্জের দিক থেকে আসছিল। এই ঘটনার উৎস খুঁজে বের করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দুটি তারার মধ্যেকার সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। একটি হলো শ্বেত বামন তারা (white dwarf), যা নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায়ে সৃষ্টি হয় এবং অন্যটি হলো লাল বামন তারা (red dwarf)। লাল বামন তারা মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ তারাগুলোর মধ্যে একটি।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আইরিস ডি রুইটার এই গবেষণার প্রধান ছিলেন। তিনি ইউরোপের লো-ফ্রিকোয়েন্সি অ্যারে (LOFAR) টেলিস্কোপ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই রেডিও তরঙ্গগুলো শনাক্ত করেন। এরপরে, অ্যারিজোনার মাউন্ট হপকিন্সের মাল্টিপল মিরর টেলিস্কোপ এবং টেক্সাসের হবি-এবারলি টেলিস্কোপের সাহায্যে লাল বামন তারাটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তারা দুটি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে আবর্তিত হচ্ছে যে তাদের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটছে।
গবেষকরা বলছেন, শ্বেত বামন তারার শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র অথবা লাল বামন ও শ্বেত বামন তারার পারস্পরিক আকর্ষণ এই রেডিও তরঙ্গ সৃষ্টির কারণ হতে পারে। এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন, কীভাবে নক্ষত্রগুলি মহাকাশে রেডিও তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে, বিজ্ঞানীরা এই যুগল তারার আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করছেন, যা তাদের মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়া এবং রেডিও তরঙ্গ নির্গমনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।
এই গবেষণা দলের সদস্য, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. কৌস্তুভ রাজওয়াডে বলেন, “আমরা আমাদের রেডিও ডেটাতে এই ধরনের কয়েকটি দীর্ঘ সময়ের পালস খুঁজে পেতে শুরু করেছি। প্রতিটি আবিষ্কার আমাদের এই চরম মহাজাগতিক বস্তুগুলি সম্পর্কে নতুন কিছু জানাচ্ছে যা থেকে আমরা রেডিও নির্গমন দেখতে পাই।”
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাতাশা হার্লি-ওয়াকার, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তিনি মনে করেন, এই আবিষ্কারগুলো ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তথ্য সূত্র: সিএনএন