উত্তর ইয়র্কশায়ারে আবিষ্কৃত বিশাল লৌহ যুগের সম্পদ, যা ব্রিটেনের ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে পারে।
যুক্তরাজ্যে আবিষ্কৃত অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ লৌহ যুগের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত দুই হাজার বছর আগের ব্রিটেনের জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। উত্তর ইয়র্কশায়ারের মেলসনবি গ্রামের কাছে একটি মাঠে খনন করে আটশটিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে।
এই বস্তুগুলি প্রথম শতাব্দীর, যখন ক্লডিয়াসের শাসনামলে রোমানরা ব্রিটেন জয় করতে আসে, সেই সময়ের। বস্তুগুলি সম্ভবত ব্রিগ্যানটিস নামক একটি উপজাতির সঙ্গে সম্পর্কিত, যারা উত্তর ইংল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত।
এই আবিষ্কারে পাওয়া জিনিসগুলির মধ্যে রয়েছে গাড়ির অংশ, যেমন ২৮টি লোহার চাকা, ১৪টির বেশি ঘোড়ার জন্য চমৎকার সাজ সরঞ্জাম, লাগাম, আনুষ্ঠানিক বর্শা এবং দুটি সুন্দর কারুকার্য করা বিশাল পাত্র (cauldrons)। এর মধ্যে একটি সম্ভবত ওয়াইন মেশানোর কাজে ব্যবহৃত হত।
খননকার্যে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে ব্রিটেনের লৌহ যুগের উপজাতিদের মধ্যে সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ভ্রমণের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে নতুন করে ধারণা করা যেতে পারে।
২০২১ সালের বড়দিনের ঠিক আগে পিটার হেডস নামের একজন মেটাল ডিটেক্টরিস্ট এই সম্পদের সন্ধান পান। তিনি একটি সংকেত পাওয়ার পর মাটি খুঁড়তে শুরু করেন এবং বিশেষজ্ঞের সাহায্য চেয়ে পাঠান।
তিনি ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক টম মুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি ওই এলাকায় গবেষণা করছিলেন। অধ্যাপক মুর সঙ্গে সঙ্গেই এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন, কিন্তু এত বড় আবিষ্কারের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি।
সাধারণত ১০টি বস্তুর একটি সংগ্রহ পাওয়া গেলেও তা বেশ অসাধারণ। কিন্তু এত বিশাল আকারের কিছু খুঁজে পাওয়া সত্যিই অভাবনীয়। আমরা এটা আশা করিনি… দলের সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
ঐতিহাসিক ইংল্যান্ডের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা) অনুদান পাওয়ার পর ২০২২ সালে খনন কাজ শুরু হয়। খননকালে ধাতব বস্তুগুলোর একটি বড় অংশ, যা সম্ভবত একসাথে একটি থলেতে রাখা ছিল, তা উদ্ধার করা হয়।
অধ্যাপক মুর জানান, ঘোড়ার গাড়ি বা রথগুলিকে সজ্জিত করতে প্রবাল এবং রঙিন কাঁচ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সে সময়ের মানুষের রুচি ও আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে। তিনি আরও বলেন, “এগুলো দেখলে মনে হতো তারা সত্যিই প্রভাবশালী এবং বিত্তশালী ছিল।
তিনি আরও যোগ করেন, “কিছু মানুষ উত্তর ইংল্যান্ডকে দক্ষিণ ব্রিটেনের লৌহ যুগের তুলনায় দরিদ্র মনে করত। তবে এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সেখানকার মানুষেরাও একই মানের উপকরণ, সম্পদ ও মর্যাদার অধিকারী ছিল। তারা দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের মতোই শক্তিশালী ছিল।
ঐতিহাসিক ইংল্যান্ডের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শক কেইথ এমেরিক বলেন, মুর সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করার দিনেই তাঁরা এই খনন কাজের জন্য অর্থ মঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “এই আবিষ্কারের আকার এবং এর মধ্যে থাকা উপাদানগুলো যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। উত্তর ইংল্যান্ড থেকে এমন কিছু পাওয়া সত্যিই অসাধারণ।
তিনি ডারহামে বস্তুগুলো সাজানো অবস্থায় দেখেছিলেন। এমেরিক বলেন, “সেটা ছিল সত্যিই একটা ‘আশ্চর্য মুহূর্ত’, যা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ এর কিছু জিনিস এত সুন্দর ও মূল্যবান ছিল যে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই আবিষ্কার ছিলো আমাদের জীবনে একবারের মতো পাওয়া অভিজ্ঞতা।
অধ্যাপক মুর জানান, ধারণা করা হচ্ছে, মূল্যবান জিনিসগুলো সম্ভবত এমন কারও ছিল যারা “সমগ্র ব্রিটেন, ইউরোপ এবং এমনকি রোমান বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আবিষ্কৃত অনেক জিনিস আগুনে পোড়া ছিল, যা ইঙ্গিত করে যে, এগুলো সম্ভবত কোনো অভিজাত ব্যক্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে একটি খাদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এমিলি উইলিয়ামস এবং অধ্যাপক টম মুর একত্রে ক্ষয়প্রাপ্ত কিছু শিল্পকর্ম পরীক্ষা করছেন।
অধ্যাপক মুর আরও জানান, এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিটেনে লৌহ যুগের উপজাতিদের ব্যবহৃত চার চাকার গাড়ির প্রথম প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত মহাদেশীয় ইউরোপের গাড়িগুলোর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমাদের ভাবতে হবে, এই গাড়িগুলো দেখতে কেমন ছিল, কোথা থেকে এসেছিল?
মেলসনবিতে পাওয়া এই সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা)। ইয়র্কশায়ার জাদুঘর জনসাধারণের জন্য এই সম্পদগুলি সংরক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রচারণা শুরু করতে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক ইংল্যান্ড, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রিটিশ মিউজিয়াম যৌথভাবে এই আবিষ্কারের ঘোষণা করেছে।
ঐতিহ্য বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস ব্রায়ান্ট বলেছেন, এই আবিষ্কার একটি অসাধারণ ঘটনা, যা “আমাদের জাতির ইতিহাসকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
কেইথ এমেরিক বলেন, এই আবিষ্কার অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। জুলিয়াস সিজার ক্লডিয়াসের আক্রমণের এক শতাব্দী আগে ব্রিটেনে প্রথম অভিযান চালান এবং ব্রিগ্যানটিসরা সে সম্পর্কে অবগত ছিল। এমেরিক বলেন, “আপনি যখন এই জিনিসগুলো দেখেন, তখন মনে হয়, এই মানুষগুলো কি কোনো কিছুর শেষের কথা ভাবছিল, নাকি কোনো নতুন কিছুর শুরু?”
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান