শিরোনাম: খরায় জর্জরিত কেনিয়ায় মেয়েদের বিক্রি করা হচ্ছে, দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচতে
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার মার্সাবিট অঞ্চলে বিগত কয়েক বছর ধরে চলা তীব্র খরা সেখানকার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। পানির অভাবে গবাদি পশু মারা যাচ্ছে, খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে, সেখানকার পরিবারগুলো তাদের মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, যাতে কিছু অর্থ ও গবাদি পশু পাওয়া যায় যা দিয়ে তারা কয়েক মাস বাঁচতে পারে। সেখানকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে বিগত ৪০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের মানুষ এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়নি।
কেনিয়ার উত্তরে, ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী মার্সাবিট জেলার রুক্ষ, শুষ্ক অঞ্চলে, জীবন ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা মূলত পশুপালনের উপর নির্ভরশীল।
কিন্তু বৃষ্টির অভাবে তাদের গবাদি পশুরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে। এর ফলে খাদ্য ও পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। সেখানকার দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে, একটি উট অথবা কয়েকটি ছাগলের বিনিময়ে মেয়েদের তুলে দেওয়া হচ্ছে অপরিচিত পুরুষের হাতে। স্থানীয় ভাষায়, এই ধরনের ‘বিয়ে’ মেয়েদের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তোলে।
ডুকানো কেল্লে নামের ৩৪ বছর বয়সী এক নারীর কথা জানা যায়। তিনি পাঁচ সন্তানের মা। খাবার এবং জলের জন্য তাকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা হেঁটে দূরের একটি কুয়োর (borehole) কাছে যেতে হয়।
জল আনতে যাওয়াটা তার কাছে একটি কষ্টকর রুটিনে পরিণত হয়েছে। ডুকানো জানান, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এখন তার উপর। একদিকে শিশুদের খাবার যোগানো, অন্যদিকে পানির জন্য সংগ্রাম—এসব করতে করতে তিনি ক্লান্ত।
আরেকজন নারী, ওয়াতো গাতো, যিনি এখন কুড়ি বছর বয়সী, জানান, তিনি যখন ১৫ বছর বয়সী ছিলেন, তখন তাকে পশু চারণের জন্য একা প্রান্তরে যেতে হয়েছিল। সেই সময় এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করে।
ওয়াতো জানান, ঘটনার পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ত্যাগ করে। এরপর তিনি কোনোমতে জীবন ধারণের জন্য সীমান্ত এলাকায় এসে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন।
এছাড়াও, বোক মোল্লু নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীর কথা জানা যায়। বোক জানান, তার বাবা-মা তাদের গবাদি পশু হারানোর পর তাকে একটি অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি হন।
বোকের ভাষায়, “আমার বাবা-মা’কে আমি দোষ দিই, কিন্তু আমি জানি, খরা না হলে তারা এমনটা করতেন না।
স্থানীয় সাহায্য সংস্থা, যেমন ‘ইন্ডিজিনাস রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (IREMO), মনে করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েছে। কারণ, নারীদের পশু চারণের জন্য দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়, যার ফলে তারা আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার অনেক দেশেই চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। কেনিয়ার এই পরিস্থিতি তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবিলম্বে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করছে। তবে, স্থানীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা