গাজায় ইসরায়েলি স্থল অভিযানের বিস্তার, উদ্বাস্তু শিবিরে মানবিক বিপর্যয়।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের স্থল অভিযান আরও জোরদার করেছে। বুধবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, তারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বিশাল এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় এবং সেগুলোকে তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় একটানা বোমা হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে এরই মধ্যে অন্তত ২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফা থেকে পালাচ্ছে, এবং তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইসরায়েলি সেনারা সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে এবং অবকাঠামো ধ্বংস করতে এলাকাগুলো “পরিষ্কার” করবে। সেই সাথে, তারা “ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অঞ্চলের” অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করবে।
তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি হামাসকে নির্মূল করতে এবং সেখানে আটক অবশিষ্ট ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে যুদ্ধ বন্ধ করা যায়। তবে কতটুকু ভূমি ইসরায়েল দখল করতে চায়, সে বিষয়ে কাটস বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজার ভেতরে একটি উল্লেখযোগ্য বাফার জোন তৈরি করেছে। যুদ্ধের আগে উপত্যকার প্রান্ত বরাবর যে এলাকা ছিল, সেটিকে তারা আরও প্রসারিত করেছে। এছাড়া তথাকথিত নেৎজারিম করিডোর সহ বিশাল এলাকা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
জানা গেছে, হামাসের সঙ্গে জানুয়ারিতে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনর্গঠনের জন্য চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এক মাস আগে গাজায় সব ধরনের পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের কাছে গাজায় আটক থাকা ৫৯ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং গাজার জন্য মানবিক সহায়তা চান। তবে তিনি যুদ্ধ বন্ধ এবং গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি নন।
অন্যদিকে, হামাস পূর্ববর্তী চুক্তিতে ফিরে আসার ওপর জোর দিচ্ছে এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে সকল জিম্মিকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় বোমা হামলা পুনরায় শুরু করেছে এবং ১৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। সোমবার, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজার দক্ষিণাঞ্চলে রাফার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
মঙ্গলবার তারা উত্তর গাজার বেইত হানুন, বেইত লাহিয়া এবং আশেপাশের এলাকাগুলোতেও এই নির্দেশ দেয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ৩৬তম ডিভিশন এই আক্রমণের জন্য গাজায় প্রবেশ করেছে এবং বুধবার ভোরে সেনারা সেখানে প্রবেশ করে। রাফার খিরবেত আল-আদাস এলাকার ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলি হামলার কারণে আটকা পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সাহায্য চেয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, বুধবারের হামলায় নিহত ২১ জনের মধ্যে ১২ জন খান ইউনিসের একটি ভবনে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন। এছাড়া রাফায় আরও ২ জন এবং নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ২ জন নিহত হয়েছে।
গাজার মধ্যাঞ্চলে দেইর আল-বালাহ থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি তারেক আবু আজ্জম জানিয়েছেন, রাফার লোকজন তাদের সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে পালাচ্ছে। এক বছর আগে মিশরের সীমান্তবর্তী শহরটিতে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের বসবাস ছিল, যাদের মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ গাজার অন্যত্র ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়ে উদ্বাস্তু হয়েছিল।
কিন্তু মে মাসে ইসরায়েল শহরটিতে আক্রমণ করে, যার ফলে প্রায় সবাই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাস পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৫০ হাজার মানুষ ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আংশিকভাবে সরে আসার পর তারা আবার ফিরতে শুরু করেছিল। আবু আজ্জম বলেন, “এবং এখন মানুষ আবার স্থানান্তরিত হচ্ছে। সবাই জানে গাজায় কোথাও নিরাপত্তা নেই।”
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা (ইউএনওসিএ) এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে বলেছে, “হাজার হাজার বেসামরিক লোক বন্দুকের গুলির মধ্যে রাফা থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।”
একজন বৃদ্ধ ইউএনওসিএ-কে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী তাকে এবং অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে। তিনি বলেন, “কিছু লোক আহত হয়েছে এবং চিৎকার করছিল, কিন্তু আমি ভয়ে পেছনে তাকাতে পারিনি।”
অন্য একজন নারী বলেন, “আমার সঙ্গে কিছুই ছিল না। আমরা পালিয়ে বালির টিলার ওপর দিয়ে হেঁটেছি। যখন আমি পালিয়েছিলাম, তখন [ইসরায়েলি] ট্যাঙ্কগুলো রাস্তার পাশে তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দেয়।”
অন্যদিকে, ইসরায়েলি জিম্মিদের পরিবারগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, “ভূখণ্ডের লাভের জন্য কি জিম্মিদের উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?” তারা আরও বলেছে, “চুক্তির মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ বন্ধ করার পরিবর্তে, ইসরায়েলি সরকার আরও সৈন্যকে গাজায় পাঠাচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যে বহুবার যুদ্ধ হয়েছে।”
এদিকে, ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজার সব বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত ২৫টি বেকারিও এর অন্তর্ভুক্ত। ফিলিস্তিনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, অবরোধের কারণে গাজা আবারও দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ অবরোধ বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক ইসরায়েলের এই দাবিকে “হাস্যকর” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন যে গাজায় পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ রয়েছে। ডুজারিক বলেন, “আমরা মানবিক করিডোর দিয়ে আসা আমাদের সরবরাহের শেষ প্রান্তে রয়েছি। আপনারা জানেন, ডব্লিউএফপি এমনি এমনি তাদের বেকারি বন্ধ করে না।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধবিরতির সময় আমরা দেখেছি গাজায় মানবিক সহায়তা আসছে। বাজারগুলো পুনরায় চালু হয়েছিল। দাম কমছিল। জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল। ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সেই পরিস্থিতিতে ফিরতে হবে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।