শিরোনাম: জিম্বাবুয়ের ঋণ ফাঁদ: উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা
উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের পথে সাম্রাজ্যবাদ একটি কঠিন বাধা। জিম্বাবুয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। দেশটির ভূমি সংস্কার নীতির ফলস্বরূপ কীভাবে আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে হচ্ছে, সেই গল্প শুনলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও অনেক কিছু শেখার আছে।
২০০০ সালের দিকে জিম্বাবুয়ে সরকার যখন শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের কাছ থেকে জমি নিয়ে ভূমিহীন স্থানীয়দের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই শুরু হয় মূল সংকট। এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো জিম্বাবুয়ের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।
এর ফলস্বরূপ, জিম্বাবুয়েকে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং সহায়তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
জমি বিতরণের সিদ্ধান্তের কারণে জিম্বাবুয়েকে এখন প্রাক্তন শ্বেতাঙ্গ জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই অর্থ পরিশোধ করতে দেশটি আবার ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একদিকে, দেশের মানুষ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে, অন্যদিকে সরকার ঋণ পরিশোধের জন্য সংগ্রাম করছে। এই পরিস্থিতিকে একটি ‘ফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, যেখানে একটি দেশ কার্যত নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।
জিম্বাবুয়ের এই সংকট কেবল দেশটির একার নয়। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ধরনের ভূমি সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সেখানেও পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার শিকার হতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমি সংস্কার কার্যক্রমের বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের কাছ থেকে জমি “জবরদখল” করছে।
জিম্বাবুয়ে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিভাবে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা এখনো বিভিন্নভাবে টিকে আছে। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশেও একই ধরনের ভূমি ব্যবস্থাপনার শিকার হতে হয়েছে।
সেখানকার স্থানীয় কৃষকদের অধিকার ছিল সীমিত, আর জমি ছিল মূলত শ্বেতাঙ্গ জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে। জিম্বাবুয়ের ভূমি সংস্কার সেই অন্যায়ের প্রতিকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু এর ফল হয়েছে ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণে, উন্নত দেশগুলো প্রায়ই উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। জিম্বাবুয়ের ঘটনা সেই চেষ্টারই একটি উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে, কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে একটি দেশকে তার নিজস্ব নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা যায়।
জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলা করার কৌশল তৈরি করতে হবে।
একইসঙ্গে, ভূমি সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তা দেশের জনগণের জন্য টেকসই উন্নয়ন বয়ে আনতে পারে।
জিম্বাবুয়ের সংকট শুধু একটি দেশের গল্প নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি সাধারণ চিত্র। উপনিবেশবাদের পুরনো ধাঁচ এখনো বিদ্যমান, যা দুর্বল দেশগুলোকে দুর্বল করে রাখে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে এবং জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশকে তাদের নিজেদের পথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে হবে।
তথ্য সূত্র: আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।