শিরোনাম: ডেনমার্কের জীবন থেকে পাওয়া ১০টি শিক্ষা: সুখী জীবনের চাবিকাঠি
ডেনমার্কে এক দশকের বেশি সময় কাটিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসা হেলেন রাসেল, ডেনমার্কের জীবনযাত্রা থেকে পাওয়া ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কিভাবে একটি সুখী ও অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করা যায়, সেই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
প্রথম শিক্ষা: “জানতেলোভেন” – নিজেকে বেশি গুরুত্ব না দেওয়া
ডেনমার্কের সামাজিক নিয়ম ‘জানতেলোভেন’ মানুষকে মাটির কাছাকাছি রাখে। এই দর্শনে বলা হয়, “তুমি আর সবার থেকে আলাদা কিছু নও”। ডেনমার্কের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে এবং প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা ও সহমর্মিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়াও, সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমাতে উচ্চ করের মাধ্যমে সম্পদ পুনর্বণ্টন করা হয়, যা একটি সুখী ও স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনে সহায়তা করে। ডেনিশ সমাজে কে কী গাড়ি ব্যবহার করে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
দ্বিতীয় শিক্ষা: সমাজে আস্থার গুরুত্ব
ডেনিশরা তাদের প্রতিবেশী, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এমনকি অপরিচিতদেরও বিশ্বাস করে। এখানকার মানুষজন বিশ্বাস করে যে, “অধিকাংশ মানুষের উপর ভরসা করা যায়”। এই আস্থার কারণে শিশুদের খেলার মাঠে একা ছেড়ে দেওয়া হয়, রাস্তায় তাদের অবাধ বিচরণ থাকে এবং মানুষজন তাদের বাড়ির বাইরে ‘ট্রাস্ট স্ট্যান্ড’ তৈরি করে পুরাতন জিনিস বিক্রি করে। যুক্তরাজ্যে এই ধরনের আস্থার অভাব দেখা গেলেও, ডেনমার্কের এই সংস্কৃতি হেলেন রাসেলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি মনে করেন, পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও সুখী সমাজ গঠন করা সম্ভব।
তৃতীয় শিক্ষা: কর্মজীবনের ভারসাম্য
ডেনমার্ক কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে সাধারণত সপ্তাহে ৩৭ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম রয়েছে এবং কর্মীদের গড় কর্মঘণ্টা ৩৩। এর ফলস্বরূপ, কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ কম থাকে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে। হেলেন রাসেল মনে করেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি শিশুদের স্কুল থেকে আনা এবং তাদের ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে কোনো কাজ করেন না।
চতুর্থ শিক্ষা: প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো
ডেনিশ সংস্কৃতিতে ‘ফ্রিলুফটসলিভ’-এর ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত, যার অর্থ হলো প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার ফলে মানসিক চাপ কমে যায়। ডেনিশরা বিশ্বাস করে, “খারাপ আবহাওয়া বলতে কিছু নেই, কেবল ভুল পোশাক আছে”। তাই তারা বৃষ্টি, তুষারপাত বা ঝড় উপেক্ষা করে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটায়।
পঞ্চম শিক্ষা: পরিবারের সঙ্গে খাবার গ্রহণ
ডেনমার্কের জীবন থেকে পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো পরিবারের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস। ডেনিশরা মনে করে, টিভি ও মোবাইল ফোন বন্ধ করে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খেলে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ডেনিশ খাবার সাধারণত সাদাসিধে হয়ে থাকে, যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।
ষষ্ঠ শিক্ষা: স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ
ডেনমার্কে প্রায় অর্ধেক মানুষ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে। তারা বিভিন্ন ক্লাব, সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিদ্যালয়ে তাদের সময় দেয়। ডেনিশরা কোনো কিছু পেতে চাইলে, নিজেরাই এগিয়ে আসে এবং তা বাস্তবায়িত করে। হেলেন রাসেল মনে করেন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সমাজ তৈরি করা সম্ভব।
সপ্তম শিক্ষা: “হিউজ” ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া
ডেনিশ জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হিউজ’, যা আরাম ও ভালো থাকার অনুভূতি নিয়ে আসে। হিউজের মূল ধারণা হলো ধীরগতিতে চলা, মানসিক চাপ কমানো এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো। ডেনিশরা প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করতে জানে।
অষ্টম শিক্ষা: শিশুদের স্বাধীনতা দেওয়া
ডেনিশরা শিশুদের স্বাধীনতা দিতে বিশ্বাসী। তারা শিশুদের ঝুঁকি নিতে এবং নিজেদের ভুল থেকে শিখতে উৎসাহিত করে। শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য তাদের উপযুক্ত স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
নবম শিক্ষা: অল্পে তুষ্টি
ডেনিশ জীবনযাত্রায় একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়, আর তা হলো “অল্পে তুষ্টি”। তারা তাদের পোশাক থেকে শুরু করে ঘরের সাজসজ্জা পর্যন্ত, সবকিছুতে বাহুল্য বর্জন করে। তারা সাধারণত ভালো মানের, টেকসই এবং প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করে।
দশম শিক্ষা: বন্ধুভাবাপন্ন হওয়া
ডেনমার্কে হেলেন রাসেল যে বিষয়টি অনুভব করেছেন তা হলো, এখানে মানুষজন সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে, তবে তারা সহজে এগিয়ে আসে না। কিন্তু তিনি মনে করেন, নতুন জায়গায় বন্ধুভাবাপন্ন হওয়াটা খুব জরুরি।
হেলেন রাসেল মনে করেন, ডেনমার্কের জীবনযাত্রা থেকে পাওয়া এই শিক্ষাগুলো যুক্তরাজ্যে তাঁর জীবনকে আরও সুন্দর করতে সাহায্য করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধারণাগুলো অনুসরণ করে যেকোনো স্থানে সুখী জীবন যাপন করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান