নতুন শুল্ক আরোপ: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাবের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি নতুন করে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার (২ এপ্রিল, ২০২৫) তিনি এক ঘোষণায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসাবে। এছাড়া, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বজায় রাখে, তাদের পণ্যের ওপর শুল্কের হার আরও বেশি হবে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘পাল্টা শুল্ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তার যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে অন্য দেশগুলো কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আরোপিত ‘অন্যায্য’ শুল্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান।
তবে, অর্থনীতিবিদরা ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, শুল্ক আরোপের ফলে আমদানিকারকদের ওপর করের বোঝা চাপবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়বে।
ফলস্বরূপ, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ইউরোপ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, তাহলে সেই পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুল্ক বাবদ প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এই অর্থ ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়।
ট্রাম্প চান, শুল্ক থেকে পাওয়া অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যবহার করে কর কর্তন করা হোক, যা সম্ভবত ধনী ব্যক্তিদের বেশি সুবিধা দেবে। এছাড়া, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে গৃহীত কর হ্রাসের মেয়াদ ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমনটা হলে ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ফেডারেল রাজস্ব ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার হ্রাস পাবে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, শুল্ক আরোপের ফলে জিনিসপত্রের দাম কত দ্রুত বাড়বে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা এবং বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীদের ওপর এটি নির্ভর করবে।
তবে, খুব দ্রুতই ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মেক্সিকো থেকে আসা কিছু পণ্যের দাম শুল্ক আরোপের সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুল্ক আরোপের ফলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। যেমন, ২০১৮ সালে যখন ওয়াশিং মেশিনের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল, ব্যবসায়ীরা শুধু ওয়াশিং মেশিন নয়, বরং ড্রায়ারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে, যদিও ড্রায়ারের ওপর কোনো নতুন শুল্ক ছিল না।
সংবিধান অনুযায়ী, শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে, বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস এই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে দিয়েছে।
সাধারণত, প্রেসিডেন্ট কেবল তখনই শুল্ক আরোপ করতে পারেন, যখন আমদানি করা পণ্য জাতীয় নিরাপত্তা বা কোনো নির্দিষ্ট শিল্পখাতের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। এক্ষেত্রে শুনানির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয় যে, আমদানি করা পণ্যের কারণে ক্ষতি হচ্ছে।
তবে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আসা ফেনটানিলকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে উভয় দেশ থেকে আসা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক অন্যান্য দেশের তুলনায় সাধারণত কম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ২.২ শতাংশ।
যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর গড় শুল্কহার ২.৭ শতাংশ, চীনের ৩ শতাংশ এবং ভারতের ১২ শতাংশ।
বর্তমানে, এই শুল্ক নীতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলে, বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্য কোনো দেশের ওপর শুল্ক বাড়ায়, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়লে, বাংলাদেশের ভোক্তাদের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্য সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস