শিরোনাম: ডাচ ক্যাফেতে নয়, পাখির বাসায় মিলছে মানবতার চিহ্ন: প্লাস্টিকের স্তূপে ঢাকা অতীতের গল্প
ছোট্ট কালো জলচর পাখি, যাদের পায়ে বড় বড় আঙুল, তাদের হয়তো শহরের কোলাহলে তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামের খালগুলোতে এদের অবাধ বিচরণ। এরা হলো ‘কুট’ পাখি, অনেকটা এলাকার মাস্তানদের মতো, সাহসী এবং একগুঁয়ে।
প্রায় ৩০ বছর আগে এরা আসে শহরের কাছাকাছি খামার এলাকা থেকে, তারপর ধীরে ধীরে এই জনবহুল শহরে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে।
বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন কীভাবে কুট পাখির মতো পাখিরা শহরের পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে, আর এই মানিয়ে নেওয়াটা তাদের জন্য কতটা ভালো, সেই বিষয়ে। সম্প্রতি, এক নতুন গবেষণায় জানা গেছে, আমস্টারডামের কুট পাখির বাসাগুলোতে জমে থাকা ৩০ বছরের পুরনো প্লাস্টিক বর্জ্যের ইতিহাস।
এই বাসাগুলো যেন মানুষের ফেলে আসা আবর্জনার এক জীবন্ত জাদুঘর, যেখানে লুকিয়ে আছে অনেক না জানা গল্প।
গবেষকরা একটি বড় আকারের পাখির বাসা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা শহরের রেড-লাইট এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। বাসার সবচেয়ে পুরোনো জিনিসটি ছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি করা একটি মার্স বার-এর মোড়ক।
আর সবচেয়ে নতুন পাওয়া জিনিসটি হলো একটি প্রোটিন বার-এর মোড়ক। এর মাঝে ছিল ক্যান্ডির প্যাকেট, ম্যাকডোনাল্ডসের স্যান্ডউইচের মোড়ক এবং মাস্ক—যা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যান্য পাখির বাসা থেকেও একই ধরনের মাস্কের স্তর পাওয়া গেছে।
গবেষকরা বলছেন, পাখির বাসার প্লাস্টিকের স্তরগুলো বিশ্লেষণ করে পাখি নয়, বরং মানুষের সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যায়। যেন এটি মানুষের ফেলে আসা ইতিহাসের একটি দলিল।
আমস্টারডামের এই কুট পাখিরা কংক্রিটের ক্যানাল, পর্যটকদের ভিড় আর গাছপালার অভাবের মধ্যেও টিকে আছে। শহরের বাইরের মনোরম খামার আর জলাভূমির তুলনায় এটি তাদের বাসা বাঁধার জন্য আদর্শ জায়গা নয়।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে তারা এখানে আসতে শুরু করে।
গবেষণার প্রধান, নেদারল্যান্ডসের ন্যাচারালিস বায়োডাইভার্সিটি সেন্টারের জীববিজ্ঞানী আউকে-ফ্লোরিয়ান হেমস্ট্রা বলেন, “কিছু সাহসী পাখি হয়তো প্রথমে এখানে এসেছিল, ঘুরে ফিরে তারা শহরের কেন্দ্রস্থলে এসে বাসা বাঁধে।”
কুট পাখিরা হাল ছাড়েনি। তারা তাদের বাসা বানানোর জন্য যা পেয়েছে, তা দিয়েই কাজ চালিয়েছে।
তাদের সংগ্রহ করা জিনিসের মধ্যে খাবার মোড়ক থেকে শুরু করে কনডম পর্যন্ত ছিল। হেমস্ট্রার ধারণা, বর্তমানে শহরে অন্তত ২০০-র বেশি কুট পাখি রয়েছে।
তাদের তৈরি করা এলোমেলো বাসাগুলো বিভিন্ন ডক, স্তম্ভ আর নৌকার ওপর দেখা যায়, যা অনেক মালিকের বিরক্তির কারণ।
হেমস্ট্রা জানতে চেয়েছিলেন, আমস্টারডামের কুট পাখির প্লাস্টিকের বাসাগুলো থেকে পাখিগুলোর আচরণ এবং মানুষের সম্পর্কে কী জানা যেতে পারে।
হেমস্ট্রা ও তাঁর সহকর্মীরা আমস্টারডামের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫টি পরিত্যক্ত কুট পাখির বাসা সংগ্রহ করেন। সবচেয়ে পুরনো বাসার প্লাস্টিক স্তরগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে তারা সেগুলোর বয়স জানার চেষ্টা করেন।
মোড়কের মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ বা পুরনো লোগো দেখে তারা সময়কাল নির্ধারণ করেন। বাসা তৈরির সময়কাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য তাঁরা গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের সাহায্য নেন, যা ২০০৮ সাল থেকে পাওয়া যায়।
হেমস্ট্রা বলেন, “আমি বিশেষ করে ম্যাকডোনাল্ডসের আবর্জনাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি।” কারণ, তারিখ নির্ণয় করার মতো অনেক জিনিস সেখানে ছিল।
পাখির বাসার সময়কাল এবং রাস্তার ছবি প্রায় মিলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি ছবিতে দেখা গেছে, একটি পাখি বাসায় বসে আছে, আবার অন্য ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাসায় প্লাস্টিক জমে আছে এবং আশেপাশে বসা মানুষজন ফাস্ট ফুডের মোড়ক থেকে খাবার খাচ্ছে।
হেমস্ট্রা বলেন, এটি তাঁর গবেষণাটিকে আরও নির্ভরযোগ্য করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সানশাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণ বিষয়ক বাস্তুবিদ ডমিনিক পোটভিন, যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, বলেছেন, পাখির বাসা পর্যবেক্ষণ করা জীববিজ্ঞানীদের জন্য পাখি সম্পর্কে জানার অন্যতম উপায়, কারণ সরাসরি তাদের কার্যকলাপ দেখা সবসময় সম্ভব হয় না।
হেমস্ট্রার মতো বিস্তারিতভাবে একটি বাসার সময়কাল নির্ধারণ করা বেশ কঠিন।
ডমিনিক পোটভিনের আগের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ সাল থেকে পাখির বাসায় প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ে, যখন সারা বিশ্বে প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল।
পোটভিন আরও বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতাগুলো দেখাটা সত্যিই দারুণ।” চামচঠুঁতি, শ্যামা পাখি এবং গাংচিলের মতো অন্যান্য পাখিও তাদের বাসা বানানোর জন্য প্লাস্টিক ব্যবহার করে।
এটি একটি বিশ্বব্যাপী ঘটনা।
তবে, বড় বাসাগুলোর মাত্র ৫ শতাংশ জিনিসপত্রের তারিখ জানা সম্ভব হয়েছে। তাই হেমস্ট্রার মনে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, প্লাস্টিকের ঘন স্তর কি বেশি মানুষের আনাগোনার সঙ্গে সম্পর্কিত? তিনি অন্যান্য পাখির পুরনো বাসাগুলো খুঁজে বের করতে চান, যেগুলোতে ১৯৫০-এর দশকের পুরনো প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার পর, প্রত্নতত্ত্ববিদরা হেমস্ট্রার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁরা পাখির বাসাগুলোকে মানব কার্যকলাপের প্রমাণ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা নিয়ে খুবই আগ্রহী।
হেমস্ট্রা বলেন, “অনেকেই হয়তো ভাবেননি যে পাখির বাসাগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতো হতে পারে। দুঃখজনক হলেও, এই ‘মানব প্রভাবে’র যুগে (Anthropocene) তা সত্যি।”
কিন্তু এই প্লাস্টিকের বাসাগুলো কি কুট পাখিদের জন্য ভালো, নাকি খারাপ?
প্লাস্টিকের বাসাগুলো প্রাকৃতিক বাসার চেয়ে বেশি দিন টেকে, তবে এর মানে এই নয় যে তারা শিকারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
পাখির শরীরে প্লাস্টিক জড়িয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে মাস্কের মতো সুতোযুক্ত জিনিস থেকে তাদের বিপদ হতে পারে। এছাড়াও, প্লাস্টিক হজম করলে বা এর থেকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক নির্গত হলে তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
পোটভিন বলেন, “একদিকে, তারা শহরের পরিবেশে টিকে থাকতে পারছে, যা আমরা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করছি, এটা ভালো। তবে আমরা এটাও দেখি যে তারা অনেক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।”
দূষিত বাতাস ও জল তাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে প্রজনন ক্ষমতাও হ্রাস পেতে পারে।
হেমস্ট্রা এবং তাঁর সহকর্মীরা প্লাস্টিক দিয়ে বাসা বাঁধার ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবেন। তিনি পাখির বাসার প্লাস্টিকের রেকর্ডগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যা মানুষের পরিবেশের প্রতি আচরণের একটি প্রতিচ্ছবি।
তথ্য সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক